অরুণ ঝা, চাকুলিয়া: এসআইআর (SIR)-এর শুনানি নিয়ে চাকুলিয়ায় (Chakulia) বৃহস্পতিবারের তাণ্ডবের ঘটনা কি পূর্বপরিকল্পিত? যে কায়দায় একাধিক জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়েছিল তা এই সম্ভাবনাকেই উসকে দিচ্ছে। এমনকি ওই অবরোধের কারণে অতিরিক্ত পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়ে বলে পুলিশ সুপার স্বীকার করেন। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এই ঘটনাকে কংগ্রেসের ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতাদের উসকানিতেই এলাকা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল বলে কংগ্রেসের পালটা অভিযোগ।
এদিকে, বিডিও অফিসে তাণ্ডবের ঘটনায় ১৫ জনকে এবং তৃণমূল পার্টি অফিসে হামলার ঘটনায় চারজন সহ মোট ১৯ জনকে গ্রেপ্তার (Arrest) করা হয়েছিল বলে সরকারি আইনজীবী সঞ্জয় ভাওয়াল জানিয়েছেন। সঞ্জয় বলেন, ‘ধৃতদের শুক্রবার আদালতে পেশ করা হলে বিচারক বিডিও অফিসের ঘটনায় তিনজনকে ছয়দিনের পুলিশ হেপাজত এবং তৃণমূল পার্টি অফিসে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত চারজনকে তিনদিনের পুলিশ হেপাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বাকিদের ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেপাজতে পাঠানো হয়েছে।’ ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না বলে প্রশ্ন করা হলে ইসলামপুর পুলিশ জেলার এসপি জেবি থমাসের বক্তব্য, ‘তদন্ত চলছে। ফলে এই মুহূর্তে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’
চাকুলিয়া ব্লক তৃণমূল সভাপতি সরাফত আলি বলেন, ‘বুধবার রাত থেকেই কংগ্রেস নেতা আলি ইমরান রমজের (ভিক্টর) ঘনিষ্ঠরা তাণ্ডবের পূর্বপরিকল্পনা ছকেছিল। তাতে ভিক্টরের পূর্ণ মদত ছিল। ভিক্টরের উসকানির জেরেই এলাকা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। উনিই ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। আমাদের পার্টি অফিসে হামলার পাশাপাশি বিধায়ককেও ধাক্কাধাক্কি করা হয়েছে। ভিক্টর সহ তার লোকজনদের বিরুদ্ধে আমি এফআইআর দায়ের করেছি।’ আপনাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাউকেই ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে দেখা যায়নি কেন? সারাফতের উত্তর, ‘চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু উত্তেজিতরা কারও কথা শোনেনি।’ ভিক্টরের প্রতিক্রিয়া, ‘নিজেদের ব্যর্থতার দায় ঠেলতেও তৃণমূলের ভিক্টরকেই প্রয়োজন পড়ছে। আসলে সবটাই ছিল শাসকদলের গেমপ্ল্যান। পরে তাণ্ডব সামলাতে না পেরে আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ তৃণমূলের উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল অবশ্য তাণ্ডবের ঘটনার পিছনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছাড়া আর অন্য কোনও রহস্য নেই বলে জানিয়েছেন। কানাইয়ার আরও বক্তব্য, ‘কমিশন যা হয়রানি করছে তাতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আছড়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।’
কী কারণে গোটা বিষয়টিকে পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করা হচ্ছে? নাম না প্রকাশের শর্তে চাকুলিয়া কালীবাড়ি মোড় এলাকায় বর্ষীয়ান এক ব্যক্তি বলেন, ‘যাদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার বয়স হয়নি লাঠি হাতে তারা কেন তাণ্ডবে অংশ নিয়েছিল এটাই বড় প্রশ্ন। এসআইআর নিয়ে তাদের তো মাথাব্যথা থাকার কথা নয়।’ এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি চাকুলিয়া বিডিও অফিস চত্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যে পথেই বৃহস্পতিবার থানা এবং বিডিও অফিসে ঢোকার চেষ্টা করেছি, অসফল হয়েছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চেষ্টার পরেও অবরোধকারীরা বাধা টপকাতে দেয়নি। তরুণ ও নাবালকদের উগ্রতা স্বাভাবিক মনে হয়নি।’
বৃহস্পতিবার চাকুলিয়া থানা ও বিডিও অফিসে ঢোকার সমস্ত দিকের রাস্তাই অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। চাকুলিয়া বাজারের দিক থেকে থানায় আসার রাস্তায় বেহেরিয়া ও বালিগোড়া ছিল অবরুদ্ধ। রামপুর হয়ে চাকুলিয়া ঢোকার রাস্তায় লোহাগাছি ও বিজুলিয়া ও থানা মোড়ে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়। কানকি থেকে চাকুলিয়া ঢোকার রাস্তায় ভুঁইধর এলাকায় অবরোধ ছিল। কানকির দিক থেকে চাকুলিয়া ঢোকার রাস্তায় বিডিও অফিসের সামনেও আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়। স্বভাবতই অবরোধের ‘প্যাটার্ন’ নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে জল্পনা তুঙ্গে। চাকুলিয়ার বিধায়ক মিনহাজুল আরফিন আজাদকে এদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বারবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
কানাইয়া বলেন, ‘চাকুলিয়ায় যা হয়েছে তা কাম্য ছিল না। আসলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের জেরে যা ঘটার ঘটেছে। এর পিছনে রাজনৈতিক কোনও ইন্ধন ছিল না।’ আপনার দলের বিধায়ককে তাহলে ধাক্কাধাক্কি করা হল কেন? কানাইয়ার উত্তর, ‘কমিশনের হয়রানির প্রতিবাদ করতে নেতারা তাদের সঙ্গে রাস্তায় নামছে না কেন, এই ক্ষোভ থেকেই ওই ঘটনা। এর পিছনেও রাজনৈতিক অভিসন্ধি কোনও কারণ নয়।’
