বর্ধমান: রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার এক অনন্য উদারবাদী মডেল তৈরি করেছে পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ওড়গ্রাম চতুর্পল্লি হাই মাদ্রাসা (Burdwan harmonious schooling)। সাধারণ মানুষের একাংশের ধারণা অনুযায়ী মাদ্রাসা মানেই কট্টর ধর্মীয় পরিবেশের আবহ—এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের কাছে এক প্রকৃত মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যেখানে আরবির পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় সংস্কৃত, আর প্রার্থনা সভায় ‘জনগণমন’-এর পাশাপাশি গাওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’।
১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসার মাধ্যমিক স্তরটি ‘মাদ্রাসা বোর্ডের’ অধীন এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরটি পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অধীনে পরিচালিত হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় এগারোশো পড়ুয়া পড়াশোনা করছে। প্রধান শিক্ষক শেখ আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, এই মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ মুসলিম এবং বাকি ৫৫ শতাংশ হিন্দু পড়ুয়া (তপশিলি জাতি, উপজাতি ও সাধারণ জাতিভুক্ত)। শুধু পড়ুয়ারা নন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রেও হিন্দু ও মুসলিমদের অনুপাত প্রায় সমান সমান।
এখানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা রাজনীতির কোনো স্থান নেই। বরং আধুনিক ও উদারবাদী শিক্ষার মাধ্যমেই অর্ধ শতাব্দী ধরে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন শিক্ষকরা। স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হোক কিংবা শিক্ষা ও খেলাধুলার নানা দিক, সবেতেই এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ঈর্ষণীয়।
উন্নত মানের পরীক্ষাগার বা ল্যাবরেটরি ছাড়াও এই মাদ্রাসায় রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম এবং অত্যাধুনিক জিম। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃথক হোস্টেলের ব্যবস্থাও রয়েছে। শিক্ষক সুপ্রভাত দে বলেন, ‘‘আমাদের মাদ্রাসায় আরবি ও সংস্কৃতর পাশাপাশি গণিত, ইংরেজি এবং বিজ্ঞানের পাঠদানও চলে স্বাভাবিক নিয়মে। ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’’
দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ব্রত চট্টোপাধ্যায় ও মীর মেহেবুব হোসেন এবং অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সোহানা পারভিন ও নবম শ্রেণির সুনিতা টুডুরা একবাক্যে স্বীকার করেছে যে, এই মাদ্রাসার পরিবেশ তাদের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে শিখিয়েছে।
ভাতারের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফা এই বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘‘যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃত পড়ানো হবে, প্রার্থনায় রাষ্ট্রীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হবে এবং দেশের সংবিধানকে মান্যতা দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হবে, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।’’

