অভিষেক ঘোষ, মালবাজার: এসআইআর (SIR)-এর কাজ সামলাতে গিয়ে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলাতে পারছিলেন না শান্তিমুনি এক্কা। সেজন্য তাঁর ওপর আইসিডিএস কর্তৃপক্ষের চাপও ছিল। মাল শহর লাগোয়া নিউ গ্লেনকো চা বাগানের বাসিন্দা শান্তিমুনির ঝুলন্ত দেহ (BLO dying case) উদ্ধারের ঘটনায় এসব তথ্য জুড়ে যাচ্ছে আত্মহত্যার তত্ত্বের সঙ্গে।
তিনি ছিলেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। একইসঙ্গে তাঁকে বিএলও’র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দুটো দায়িত্ব সামলাতে বিএলও-দের ওপর চাপ কতটা হতে পারে, শান্তিমুনি তার বড় উদাহরণ। বিএলও’র দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তিনি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে নজরও দিতে পারেননি। গত আড়াই সপ্তাহ তিনি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রমুখী হননি। কেন্দ্রের সমস্ত কাজ একা হাতে সামলেছেন সহায়িকা প্রমীলা মিঞ্জ।
কিন্তু শুধু রান্না, খাওয়ানো বা পড়ানোই নয়, পাশাপাশি রোজ দপ্তরের পোষণ অ্যাপে তথ্য আপলোড করা একেবারেই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে পড়ে। সেই কাজটি শান্তিমুনি একেবারেই যে করতে পারছিলেন না, তার প্রমাণ আইসিডিএস কর্মীদের সঙ্গে সুপারভাইজারের যোগাযোগের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। সেই গ্রুপে এলাকার সুপারভাইজার ঐশ্বর্য মোহন্ত গত কয়েকদিনে বারবার নির্দেশ দিলেও শান্তিমুনি সাড়া দেননি।
পোষণ অ্যাপ সারাদিনে একবারও চালু করার সময় পাননি তিনি। ফলে সেই হোয়াইটস্যাপ গ্রুপে বারবার শান্তিমুনির নাম উল্লেখ করে লগ-ইন করতে বলেন সুপারভাইজার। কয়েকদিনের ফেলে রাখা কাজ শেষ করতেও বলেন। এতে আইসিডিএস-এর স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছিল বলে মঙ্গলবার রাতে শান্তিমুনিকে ফোন করেন সুপারভাইজার ঐশ্বর্য। তিনি দিনে অন্তত একবার অ্যাপটি চালু করতে বলেছিলেন শান্তিমুনিকে। সেটা না করায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন ঐশ্বর্য।
ঐশ্বর্য বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমি শান্তিমুনি দিদিকে ফোনে সমস্ত বুঝিয়ে বলি। উনি আচ্ছা ঠিক আছে বলে ফোন রেখে দেন। এরপর বুধবার ওঁর মৃত্যুর খবর শুনে আমি শিউরে উঠি।’ ওই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সহায়িকা প্রমীলা বলেন, ‘বিএলও-র ডিউটির জন্য আসতে না পারলেও সেন্টার তো বন্ধ রাখা যায় না। ওঁর ছেলে সেন্টারের সব জিনিসপত্র পৌঁছে দিতেন।’ তবে পোষণ অ্যাপের কাজ বকেয়া ছিল বলে মানলেন প্রমীলা।
মালের সিডিপিও সায়ক দাস বলেন, ‘যা হয়েছে, সেটা দুঃখজনক। আমরা ওঁর পরিবারের পাশে আছি।’ বিএলও’র কাজেও যে শান্তিমুনি স্বস্তিতে ছিলেন না, তা মনে হয়েছে ওঁর ছেলে ডিসুজার কথায়। তাঁর অভিযোগ, ‘রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা সেভাবে সহযোগিতা করতেন না মা-কে।’ ডিসুজার কথায়, ‘মা ভোর ৫টায় উঠে রান্না, ঘরের কাজ শুরু করতেন। সারাদিন সমীক্ষা করে রাতে বাড়ি এসেও বিশ্রাম পেতেন না। মাঝেমধ্যে কান্নাকাটি করতেন।’
২০/১০১ অংশের বিএলও শান্তিমুনি ২৫ বছরের বেশি সময় আইসিডিএসে কর্মরত ছিলেন। এতদিন তাঁর কাজ নিয়ে কারও কোন অভিযোগ ছিল না। বিএলও-র দায়িত্ব পাওয়ার পরই সমস্যা দেখা দেয়। আত্মীয়দের দাবি, বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে কথা বলারও সময় পেতেন না তিনি। আদতে সাদরিভাষী শান্তিমুনির বিএলও’র কাজে ভাষা সমস্যা ছিল বলে অভিযোগ অবশ্য নস্যাৎ করেছে তাঁর পরিবার।
এনুমারেশন ফর্ম ভর্তি ও বিএলও’র সমস্ত কাজ তাঁকে বাংলায় করতে হত। তাতে তাঁর সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছেন, গত ২৫ বছর ধরে তিনি আইসিডিএস-এর রিপোর্ট বাংলাতেই জমা দিয়েছেন। মৃতার স্বামী সুখুও বলেন, ‘আমার স্ত্রী বাংলা ভাষায় যথেষ্ট সড়োগড়ো ছিলেন। বাংলায় ফর্ম বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’ তবে বিএলও’র কাজে সমস্যা হয়েছে বাগানের শ্রমিকদের ফর্ম পূরণ করাতে গিয়ে। ওই শ্রমিকদের অধিকাংশের বাংলা অক্ষরজ্ঞান নেই। ফলে ফর্ম পূরণে ভুল হত। সেটা সংশোধন করতেও হিমসিম খেতেন শান্তিমুনি।
তাঁর মৃত্যুর দু’দিন পরেও এসআইআর-এর ফর্ম তাঁর বাড়িতেই আছে। মাল মহকুমার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। মালের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক রোশনপ্রদীপ দেশমুখ জানিয়েছেন, পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। শান্তিমুনির পরিবার ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, শান্তির উপার্জনে সংসার চলত। স্বামীর উপার্জন যথেষ্ট নয়। পরিবারের আক্ষেপ, মৃত্যু নিয়ে এত কথা হলেও ক্ষতিপূরণ নিয়ে কেউ কিছু বলছেন না।
