প্রসেনজিৎ সাহা, দিনহাটা: ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতিও পাকিস্তানি। রাজ্যপাল বাংলাদেশি পাকিস্তানি। খোদ পদ্ম সাংসদ নগেন রায়ের এমনই দাবি। শনিবার সিতাই বিধানসভার আদাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সিঙ্গিমারি নদীর ধারে পুষনা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুগামীদের নিয়ে নগেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে নগেন এসআইআর নিয়ে নিজের দলকেই রীতিমতো তোপ দাগেন। তাঁর কথায়, ‘গৃহমন্ত্রী বলছেন আগে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাবেন। তারপর তথ্যপ্রমাণ দেখাতে হবে। আমরা ভূমিপুত্র হয়ে তথ্যপ্রমাণ দেখাব? ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানি, রাষ্ট্রপতি পাকিস্তানি, রাজ্যপাল বাংলাদেশি পাকিস্তানি।’ তঁার কথা শুনে উপস্থিত সবাই হাততালিতে এলাকা ভরান।
তাঁর বক্তব্যের ভিডিও পরে ভাইরাল হয়ে ছড়াতে শুরু করে। বক্তব্যে নিজের বলা কথাগুলি যে কতটা বুমেরাং হয়েছে তা এখন নগেন বিলক্ষণ টের পাচ্ছেন। তিনি আপাতত ব্যাকফুটে। প্রতিক্রিয়া জানতে পরে তাঁর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। উত্তরবঙ্গ সংবাদের নাম শুনেই তিনি ফোন কেটে দেন। গোটা বিষয়টি প্রচণ্ড স্পর্শকাতর হওয়ায় বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেসের কেউ কোনও মন্তব্য করতে চায়নি। বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ বর্মনের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘এসআইআর নির্বাচন কমিশনের রীতি মেনেই হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যপালকে উদ্দেশ্য করে কী বলেছেন তা শুনিনি। শুনলে পরে যা বলার বলব।’ উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ কোনও মন্তব্য করেননি। তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি।
বিধানসভা ভোট আসন্ন। নগেন ঘর গোছাতে মাঠে নেমে পড়েছেন। পদ্ম শিবিরের এই সাংসদ রাজনীতির ময়দানে বেশ ভারসাম্যের খেলা খেলতে পটু বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে। পদ্ম সাংসদ হলেও, বিজেপির প্রার্থীপদ থেকে কোচবিহারকে পৃথক রাজ্য ঘোষণা নিয়ে নগেনকে বরাবরই দলীয় অবস্থানের বিরোধিতা করতে দেখা গিয়েছে। আর এ কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে নগেনের গুরুত্ব বেশি। রাজ্যের বিভিন্ন মন্ত্রীর সাক্ষাৎ থেকে কোচবিহার সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রীর স্বয়ং নগেনের বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া, এমনটাই প্রমাণ করে। ভোটের আগে নিজের দর বৃদ্ধিতে অনুগামীদের নিয়ে নগেন মাঠে নেমেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
লক্ষ্য পূরণে নগেন রাজবংশী সংস্কৃতির ঐতিহ্য পুষনা উৎসবকে বেছে নিয়েছেন। এই উৎসব আদতে এক বনভোজন। আর একেই নগেন জনসংযোগের নয়া পন্থা বানিয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল জনসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের বার্তা দিচ্ছে। নগেনও পিছিয়ে থাকতে চাইছেন না। আর তাই তিনি পুষনা উৎসব নিয়ে আগ্রহী হয়েছেন। বিষয়টি নগেন অবশ্য নিছকই রাজবংশী সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবেই দেখছেন। তাঁর কথায়, ‘সাধারণ মানুষ উৎসবের আয়োজন করে আমাকে এখানে ডেকেছে। তাই এখানে এসেছি। এর বেশি কিছু নয়।’
কোচবিহার জেলার নয়টি বিধানসভা আসনেই রাজবংশী ভোটের কমবেশি প্রভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে নগেন একটা বড় ফ্যাক্টর। এই বিধানসভাগুলির একাধিক এলাকায় নগেনের যেমন কর্তৃত্ব রয়েছে তেমনি আবার বেশ কিছু এলাকায় বংশীবদন গোষ্ঠীর প্রভাব বেশ। বংশীবদন গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই তাদের শক্তি যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে। দিনহাটা শহরের বুকে প্রকাশ্যে সমাবেশ করে খোদ তৃণমূল ও বিজেপিকে নিশানা করে তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। নগেনও পিছিয়ে থাকতে চাইছেন না। আর তাই এই গোষ্ঠী এবারে পুষনা উৎসবকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দিনসাতেক আগেই শীতলকুচিতে এমনই এই উৎসবের মাধ্যমে নগেন কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হন। তা নিয়ে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করেছিলেন।
শনিবার সিতাইয়ের আদাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এই পুষনা উৎসবের আয়োজন হয়। নগেন যেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি খোদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তোপ দাগেন। আজকের ঘটনার পর পদ্ম শিবিরে তাঁর অবস্থান কী হয় সেদিকে রাজনৈতিক মহলের কড়া নজর রয়েছে। অন্যদিকে, যে দলের সাংসদ নিজের প্রধানমন্ত্রীকেই পাকিস্তানি বলে দাবি করেন, তিনি তৃণমূলে এলে কী করবেন ভেবেই কি তারা এদিন কোনও মন্তব্য করেনি? প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে।
