সানি সরকার, শিলিগুড়ি: এবার পদ্মবনে ‘ভাষার বীজ’ পোঁতা হচ্ছে। সরাসরি উত্তরবঙ্গকে পৃথক রাজ্য করার দাবি নয়, তার বদলে কেন অষ্টম তফশিলে রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষা অন্তর্ভুক্ত হবে না, সেই প্রশ্ন তুলে দিল বিজেপি (BJP)। পৃথক রাজ্যের দাবি নিয়ে বিজেপির মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ভাষার দাবি নিয়ে কিন্তু কোনও দ্বিমত নেই। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা (Amit Shah)-কে পাঠানো চিঠিতে উত্তরবঙ্গের সমস্ত বিধায়কের স্বাক্ষরে তা স্পষ্ট। দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে দাবিপত্রে সই করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার রাজভবনে থাকাকালীন তিনি বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের কাছে। ’২৬-এর ভোটের নকশা তৈরিতে যে বিজেপি উত্তরবঙ্গে রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষাকে সামনে নিয়ে আসতে চাইছে, তা পরিষ্কার।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজেপি অঙ্ক কষে পা ফেলে। ভোট এলেই পৃথক রাজ্যের দাবিকে সামনে নিয়ে আসা হয়। এবার ধর্মীয় মেরুকরণে বেশি নজর দিচ্ছে বিজেপি। কিন্তু উত্তরবঙ্গে ধর্মীয় তাস ফেলে বাজিমাত করা অসম্ভব। পৃথক রাজ্যের দাবিতেও নতুন করে চিঁড়ে ভিজবে না, তা বুঝতে পারছে গেরুয়া শিবির। যে কারণে, রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষার স্বীকৃতি বা অষ্টম তফশিলে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘদিনের দাবিকে সামনে নিয়ে আসার কৌশল।
পৃথক রাজ্যের দাবির সপক্ষে থাকা মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মনও এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। মূলত তাঁর প্রস্তাবে সহমত হয়ে উত্তরবঙ্গে থাকা বিজেপির ২৫ জন বিধায়কের মধ্যে ২৪ জন সই করেছেন। ইংরেজবাজারের শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী দিল্লিতে থাকায় সই করতে পারেননি। তবে দলবিরোধী কাজ করায় অভিযুক্ত এবং যার জেরে বিজেপির সক্রিয় সদস্যপদ না পাওয়া কার্সিয়াংয়ের বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা সই করেছেন। যদিও তাঁর দাবি, তিনি বিজেপিতে আছেন এবং থাকবেন।
শা-কে পাঠানো চিঠিতে অষ্টম তফশিলে রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষার অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতার ক্ষেত্রে পঞ্চানন বর্মা, চিলারায়ের অবদান যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনই ইতিহাসের পাতা থেকে নানান ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। যেমন বিআর আম্বেদকরের সঙ্গে সংবিধান রচনায় প্রাক্তন সাংসদ উপেন্দ্রনাথ রায়ের অংশগ্রহণ, শরৎচন্দ্র সিনহার অসমের মুখ্যমন্ত্রী থাকা। বাদ যায়নি ধর্মনারায়ণ বর্মা, নগেন্দ্রনাথ রায়, প্রতিমা বড়ুয়া সহ পদ্মশ্রী পাওয়া। আনন্দময়ের বক্তব্য, ‘আমাদের সমাজে মণিমুক্তোর অভাব নেই। কিন্তু আক্ষেপ, ভাষার স্বীকৃতি পেলাম না। তবে এই দাবির সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই।’
নির্বাচনের সম্পর্ক যে আছে, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় তুফানগঞ্জের বিধায়ক মালতী রাভার বক্তব্যে। তিনি বলছেন, ‘রাজবংশী, কামতাপুরি ভাষা আকাদেমি এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তা আমাদের কোনও কাজেই আসছে না। তৃণমূল শুধু রাজনীতি করছে। রাজবংশীদের জন্য কিছু করলে, তা করবে বিজেপি।’ বৃহস্পতিবার বিধানসভায় রাজবংশীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষ বলছেন, ‘আমাদের সুশীল বর্মন যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর বাচনভঙ্গি নিয়ে কটাক্ষ করতে থাকেন তৃণমূল বিধায়করা। আমরা প্রতিবাদ করি। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তাঁর দলের বিধায়কদের শান্ত করেন। কিন্তু রাজবংশীদের সম্পর্কে তৃণমূলের মনোভাব কী, এই ঘটনায় স্পষ্ট।’ রাজবংশীদের এই দাবি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন মালদার বিধায়ক গোপালচন্দ্র সাহাও।
