শুভঙ্কর চক্রবর্তী
প্রশান্ত বর্মনের নাম আজ আর রাজ্যবাসীর কাছে অজানা নয়। একের পর এক কুকীর্তি, দুর্নীতি এবং বেআইনি কার্যকলাপের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। সংবাদমাধ্যমের পাতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চায়ের আড্ডা- সর্বত্রই প্রশান্তর অপকর্ম নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে (Prasanta Barman)। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের নীরবতাও প্রমাণ করে যে, তিনি কতটা প্রভাবশালী। এত কিছুর পরেও ‘পলাতক’ প্রশান্তকে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার না করায় সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করেছে। রাখঢাক না রেখেই প্রশান্ত ইস্যুতে সাধারণ মানুষ তৃণমূল, বিজেপি (BJP) দুই দলকেই এক আসনে রেখে বিচার করতে শুরু করেছেন। গোটা ঘটনায় সবচেয়ে বেশি চোখে লাগছে রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের রহস্যময় নীরবতা।
যদিও প্রশান্তর বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ করবে বলে দাবি করেছেন বিজেপির উত্তরবঙ্গের প্রভাবশালী বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায় থেকে শংকর ঘোষ প্রত্যেকেই। শিখার কথা, ‘প্রশান্ত নিশ্চয়ই গ্রেপ্তার হবে৷ গ্রেপ্তার হতেই হবে।’ তাই যদি হয় তাহলে সোমবার হাতের নাগালে পেয়েও পুলিশ প্রশান্তকে ছেড়ে দিল কেন? প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর দেননি শিখা। তিনি বলেন, ‘সবটাই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। দারুণভাবে পদক্ষেপ হবে ওর বিরুদ্ধে।’ শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষের বক্তব্য, ‘প্রশান্তর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠছে এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে ওকে নিয়ে যে ক্ষোভ আছে সেকথা দায়িত্ব নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব, এটুকু কথা দিতে পারি।’ তবে শিখা বা শংকরের আশ্বাসে আর তেমন ভরসা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষজন।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন বিজেপি এই রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের আসনে ছিল। সেই সময় প্রশান্তর বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে সরব হয়েছিলেন তাদের নেতারা৷ বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নিজেও প্রশান্তর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন। রাজ্যের তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রশান্তকে আড়াল করার অভিযোগ তুলে পদ্ম ব্যানারে রাজগঞ্জের বিডিওর দপ্তরে বিক্ষোভও হয়েছিল। সে সময় শাসকের তীব্র সমালোচনা করে বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন, পুলিশ ‘দলদাসে’ পরিণত হয়েছে এবং অপরাধীদের মদত দিচ্ছে। বিভিন্ন জনসভা, সাংবাদিক বৈঠক এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁরা প্রশান্তর গ্রেপ্তারের দাবিও তুলেছিলেন। সাধারণ মানুষও তাঁদের সেই প্রতিবাদী রূপ দেখে ভরসা পেয়েছিলেন, বিশ্বাস করেছিলেন যে ক্ষমতার পালাবদল হলে হয়তো রাজ্যে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে এবং প্রশান্তর মতো অভিযুক্তদের সঠিক বিচার হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। যে বিজেপি একদিন বিরোধী আসনে বসে গলা ফাটিয়েছিল, আজ তারাই রাজ্যের শাসকদল। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর, পুলিশ ও প্রশাসন এখন তাদেরই অঙ্গুলিহেলনে চলে। অথচ, এখনও প্রশান্তর বিরুদ্ধে কোনওরকম আইনি পদক্ষেপ করা হচ্ছে না। প্রশাসন, পুলিশ যেন আগের মতোই ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে। কেন এই নীরবতা? বিরোধী দলে থাকতে যে প্রশান্ত বিজেপির চোখে ছিল একজন ‘মহা-অপরাধী’, আজ ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের ফাইলগুলো হঠাৎ করে হিমঘরে চলে গেল কীভাবে? এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির দ্বিমুখী নীতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে কি ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর পর রাজনৈতিক নেতাদের নীতির রাতারাতি পরিবর্তন ঘটে? সাধারণ মানুষের মনে এখন এই প্রশ্নই ঘুরছে। এখন অবশ্য এইসব প্রশ্নে বিব্রত বোধ করছেন অনেক বিজেপি নেতা। রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুও প্রশ্ন শুনে প্রশান্তর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন।
প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও তৃণমূল নেতারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। কোথাও কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ, কোথাও হুমকি দেওয়ার। কিন্তু ‘সুশাসন’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া পদ্ম নেতারা প্রশান্তর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে কুলুপ এঁটেছেন৷ ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগান বাস্তবায়িত না হওয়ায় দিনের শেষে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আইনকে প্রহসনে পরিণত করা প্রশান্তর ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন রাজগঞ্জের ঠিকাদাররা। খুন হওয়া স্বর্ণ কারিগর স্বপন কামিল্যার স্ত্রী মমতা ভয়ে ছেলে, মেয়েকে নিয়ে ওডিশায় ভাইয়ের কাছে চলে যেতে চাইছেন। বিরোধী আসনে বসে যাঁরা গলা ফাটিয়ে বলেছিলেন, অপরাধীদের কোনও রাজনৈতিক রং হয় না এবং আইন সবার জন্য সমান। সেই বিজেপির কাছে বিচার চাইছেন মমতা কামিল্যারা।
প্রশান্তকে নিয়ে পুলিশ, প্রশাসনের লুকোচুরি খেলা সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করছে যে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রভাব থাকলে অপরাধ করেও সহজেই পার পেয়ে যাওয়া যায়, তা রাজ্যের মসনদে যে দলই বসে থাকুক না কেন। তৃণমূলের আমলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে নেমে গিয়েছিল। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল ন্যায়ের স্বার্থে, এক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার হাত থেকে বাঁচতে। শাসক হিসেবে বিজেপির কর্তব্য সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা। যদি সত্যিই বিজেপি সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তবে অবিলম্বে প্রশান্তর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায়, বিরোধিতার সময় তাদের সেই গগনভেদী হুংকার যে কেবলই রাজনৈতিক ফায়দা লোটা এবং ভোটবাক্স ভরার কৌশল ছিল, তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকবে না।
