আজাদ, মানিকচক: চারদিকে ঘোলা জল। থইথই করছে। কোথাও বাড়ির দরজা-জানলা পর্যন্ত জলের দখলে, কোথাও জলের বুক থেকে শুধু ছাদটুকু মাথা তুলে আছে। যে রাস্তায় প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত ছিল, সেখানে এখন নৌকা চলছে। মাঠ নেই, বাজার নেই, চেনা পথ নেই।
যত দূর চোখ যায়, শুধু জল আর জল। সাতদিন ধরে সেই জল দেখতে দেখতে ক্লান্ত ভূতনির মানুষের চোখ। এখন তাঁদের কাছে খাবার বা ত্রাণের চেয়েও যেন বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে এক টুকরো শুকনো ডাঙা (Bhutni Flood Disaster)।
‘চারদিকে ধু-ধু জল দেখতে দেখতে চোখ পচে গেল। কতদিন হয়ে গেল ডাঙা জমি দেখি না।’ এটাই এখন ভূতনির মানুষের হাহাকার।
গত বৃহস্পতিবার সাতসকালে রিংবাঁধ ভেঙে ভূতনির লোকালয়ে জল ঢুকতে শুরু করেছিল। গঙ্গার প্রবল স্রোতে নতুন রিংবাঁধের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশের আর কোনও অস্তিত্ব নেই। সেই বিশাল খোলা অংশ দিয়ে গত সাতদিন ধরে জল ঢুকেই চলেছে। ভূতনির তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ১০০ শতাংশ এলাকা এখন জলমগ্ন। রিংবাঁধ ছাড়া প্রায় গোটা ভূতনিই গঙ্গার জলের দখলে। গঙ্গার আসল গতিপথ কোনটি, তা বোঝারও উপায় নেই।
ভূতনির রাস্তাঘাট, বাজার, থানা, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, কৃষিজমি— সবই এখন জলের নীচে। মথুরাপুর ভূতনি ব্রিজ থেকে উত্তর চণ্ডীপুর ও হীরানন্দপুর যাওয়ার প্রায় ১৭ কিলোমিটার ঢালাই রাস্তাতেও থইথই করছে জল। গত শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে সড়কপথে ভূতনির সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ। নীচু এলাকাগুলি প্রথমেই ডুবেছে। গত রবিবার থেকে প্রায় সমস্ত এলাকাই জলমগ্ন।
এই জলের মধ্যে উঁচু ডাঙা বলতে এখন শুধু রিংবাঁধ। জল বাড়তে শুরু করলেও প্রথম দিকে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের বাড়ি আঁকড়ে ছিলেন। পরে জল আরও বাড়লে ভয় এবং প্রশাসনের পরামর্শে অনেকে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেন শিবিরে। আরও জল বাড়ায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকে উঠে আসেন রিংবাঁধের ওপর। ভূতনির জনসংখ্যা দেড় লক্ষেরও বেশি। ফলে বাঁধের ওপর সামান্য শুকনো জায়গার জন্যও লড়াই শুরু হয়েছে। এক টুকরো ডাঙায় মাথা গোঁজার লড়াই।
তবে এখনও বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বাড়িতেই পড়ে রয়েছেন। কেউ বাড়ির ছাদে, কেউ টিনের চালের ওপর দিন কাটাচ্ছেন। ছোট ও বয়স্কদের অনেককেই আগে নিরাপদ জায়গায় পাঠানো হয়েছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে, বিশেষত শিশুদের, কেউ কেউ ভূতনির বাইরে আত্মীয়দের বাড়িতেও পাঠিয়েছেন।
উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের থানাপাড়ার ৭৮ বছরের বিধবা জুলেখা বেওয়ার বাড়ির সামনেই এক সময় ছিল মূল রাস্তা। এখন সেই রাস্তার ওপর একগলা জল। একতলা বাড়ির ছাদে বসে থাকেন বৃদ্ধা। নৌকা বাড়ির পাশ দিয়ে গেলেই ডাক দেন। জলের মধ্যে বসে তাঁর একটাই প্রশ্ন, ‘বন্যার জল কবে নামবে বলতে পারো? প্রতিদিন তো জল বেড়েই চলেছে।’
১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে ভূতনিতে এসেছিলেন জুলেখা। তখন কোনও বাঁধ ছিল না। জীবনে অনেক বন্যা দেখেছেন। তাঁর ভিটাবাড়ি উঁচু হওয়ায় কোনওদিন জল ঢোকেনি। কিন্তু এবারের জল যেন তাঁর চেনা ভূতনিটাকেই মুছে দিয়েছে। জুলেখার কথায়, ‘তখন তো কোনও বাঁধ ছিল না। অনেক বন্যা দেখেছি। আমাদের ভিটাবাড়ি উঁচু থাকায় কোনওদিন জল ঢোকেনি। কিন্তু এবারে গত সাতদিন ধরে চারদিকে জল দেখতে দেখতে চোখ যেন পচে গেল। যত দূর চারদিকে চোখ যাচ্ছে, কোথাও এক টুকরো ডাঙা জমি দেখতে পাচ্ছি না।’
জলের মধ্যে নৌকায় দেখা হয়ে গেল পাঁচ বছরের পায়েল ও তার ১২ বছরের দাদা সোমনাথের সঙ্গে। উত্তর চণ্ডীপুর স্কুলপাড়ায় তাদের বাড়ি। নৌকা স্কুলপাড়ার কাছে পৌঁছাতেই এক বাড়ির সামনে থেকে ডাক আসে। একগলা জল ভেঙে টিনের ডিঙি নৌকা নিয়ে ছেলেমেয়েদের কাছে হাজির হন বাবা কার্তিক মণ্ডল। কার্তিক বলেন, ‘জল বাড়তেই আমার ছোট দুই ছেলেমেয়েকে সামসী মাসির বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। তবে গত দু’দিন থেকে বাড়ি আসার জন্য আমার মেয়ে কেঁদেই চলেছে। খুব ভয়েই আছি। চারদিকে শুধু জল। এক টুকরো শুকনো জমি নেই। একটু অসাবধান হলেই বড়সড়ো বিপদ হতে পারে। রাতে ভয়ে ঘুমোতে পারি না। তাই ভয় পেয়েই ছেলেমেয়েকে নিরাপদ জায়গায় রেখে এসেছিলাম।’
ভূতনির তিনটি বড় বাজার— গোবর্ধনটোলা বাজার, উত্তর চণ্ডীপুর ফাঁড়ি মোড় বাজার এবং দক্ষিণ চণ্ডীপুর পঞ্চায়েত বাজার। তিনটি বাজারের বুকেও এখন জল। বাজারের ভিতর দিয়ে চলছে নৌকা। যে জায়গাগুলিকে ভূতনির মানুষ চেনেন বাজার, চত্বর, রাস্তার মোড় হিসেবে, সেখানেও এখন জলের বিস্তার।
উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একাধিকবারের প্রধান মহম্মদ বাসিরও এমন ছবি আগে দেখেননি। তিনি বলেন, ‘অনেক বন্যা দেখেছি। তবে যতই বন্যা হোক, আমাদের গোবর্ধনটোলা বাজার, খোশবারটোলা চত্বর, পুলিশ ফাঁড়ি মোড়, কাঠমিল চত্বর কোনওদিন জলমগ্ন হয়নি। কিন্তু এবার এইসব চত্বরেই বন্যার জল দাঁড়িয়েছে। কোথাও পাঁচ ফুট, সাত ফুট, আবার কোথাও ১০ ফুটও। ভূতনিজুড়ে এখন কোথাও এক টুকরো ডাঙা জমি পাওয়া যাবে না।’
ভূতনির তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ এখন বানভাসি। মাথা গোঁজার ত্রিপল নেই, ত্রাণসামগ্রী নেই, দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তাও নেই। তবু এত কিছুর মাঝেও তাঁদের হাহাকারটা যেন অন্য রকম। তাঁরা এখন শুধু একটু ডাঙা খুঁজছেন।
সাতদিন ধরে জল দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখগুলির সামনে তাই এখন একটাই অপেক্ষা— কবে জল নামবে। কবে আবার জলের নীচ থেকে জেগে উঠবে রাস্তা, মাঠ, বাজার আর চেনা ভিটে। কবে চোখের সামনে ফিরবে এক টুকরো শুকনো মাটি।

