উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক পালাবদল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে ‘মেজোবোন’ নন্দীগ্রামে মেগা ফাইটে হারতে হয়েছিল, সেই মেজোবোনের ক্ষতে প্রলেপ দিতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিরে এসেছিলেন নিজের ঘরের মাঠ তথা ‘বড়বোন’ ভবানীপুরে (Bhawanipore Election Outcome)। সেবার ৫৮ হাজারের বেশি রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর পর, ২০২৬-এর মহাযুদ্ধে সেই ‘বড়বোন’ ভবানীপুরই চরম প্রত্যাখ্যান করল তাঁকে। ঘরের মাঠে নিজের চেনা পিচেই বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই কেন্দ্রে হারের পাশাপাশি খোদ নিজের ওয়ার্ডেই শুভেন্দুর কাছে হেরেছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বুথভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করতেই চক্ষু চড়কগাছ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। ভবানীপুর বিধানসভার ২৬৭টি বুথের প্রতিটিতে যেখানে ভোটদাতার সংখ্যা ছিল গড়ে ৪০০ থেকে ৭০০, সেখানে এমন অনেক বুথ রয়েছে যেখানে ‘ভবানীপুরের ভূমিকন্যা’ ১০০টি ভোটও ছুঁতে পারেননি। এমনকি, ৫০ বা তার কম ভোট পাওয়ার মতো নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটেছে ২৮টি বুথে।
সবচেয়ে হাড়হিম করা তথ্য উঠে এসেছে ২২৭ নম্বর বুথ থেকে। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন মাত্র ১২টি ভোট! এছাড়া ১১ নম্বর বুথে তৃণমূল যেখানে ৭০টি ভোট পেয়েছে, সেখানে শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ১০৬টি ভোট। ১৪ নম্বর বুথে ৪৩, ১৬ নম্বর বুথে ৪২, ২০ নম্বর বুথে ৪১, ২৪ নম্বর বুথে ৪৫, ৭৭ নম্বর বুথে ৪০, ৮৯ নম্বর বুথে ৪১ এবং ১০৫ নম্বর বুথে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পেয়েছেন মাত্র ৩১টি ভোট। এই ধস এখানেই থামেনি; ১৪৯ নম্বর বুথে ৪৪, ১৫৮ নম্বর বুথে ৪৬, ১৭৬ নম্বর বুথে ২৯, ২৪২ নম্বর বুথে ৪০, ২৪৯ নম্বর বুথে ২৮ এবং ২৬৩ নম্বর বুথে মাত্র ৩০টি ভোট পড়েছে তৃণমূলের ঝুলিতে।
২০৭টি বুথে দাপট শুভেন্দুর, ধূলিসাৎ ’২১-এর রেকর্ড: কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুরের মোট ২৬৭টি বুথের মধ্যে ২০৭টি বুথেই একচ্ছত্র লিড পেয়েছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র ৬০টি বুথে লিড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও উল্টো দিকে শুভেন্দু অধিকারীও ৩৯টি বুথে ৫০ বা তার কম ভোট পেয়েছেন, কিন্তু সার্বিক লিডের অঙ্কে তিনি মমতাকে অনেকটাই পেছনে ফেলে দিয়েছেন। ভবানীপুরে এবার গেরুয়া শিবিরের শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন মোট ৭৩,৯১৭টি ভোট। আর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলিতে এসেছে মাত্র ৫৮,৮১২টি ভোট। ফলে ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে ভবানীপুর ছিনিয়ে নিলেন শুভেন্দু।
২০২১ সালের উপনির্বাচনে এই ভবানীপুর থেকেই ৮৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালকে ৫৮,৩৮৯ ভোটে হারিয়েছিলেন মমতা। সেবার বিধানসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মার্জিনের প্রায় দ্বিগুণ লিড তুলে নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি, ’২১-এর মূল নির্বাচনে যে ৭০ ও ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূল পিছিয়ে ছিল, উপনির্বাচনে সেই দুটি ওয়ার্ড সহ ভবানীপুরের মোট ৭টি ওয়ার্ডেই একাধিপত্য কায়েম করেছিলেন মমতা। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনী হাওয়া সম্পূর্ণ উল্টো বইল। ভবানীপুরের এই মেগা ফল্টলাইন এবং নিজের খাসতালুকে মমতার এই পরাজয় রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।
