রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: বছরতিনেক আগেকার কথা। মায়ের মৃতদেহের পাশ থেকে জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল সুইটিকে (Leopard Sweetie)। তারপর শুরু হয় যমে-চিতাবাঘে টানাটানি। মেডিকেল টিম গঠন করে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর যেন দ্বিতীয় জীবনদান হয় তার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার সেই কাহিনী জায়গা করে নিয়েছিল আন্তর্জাতিক জার্নালে। বড় হয়ে ওঠা শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি (Bengal Safari) পার্কে।
রোজ এনক্লোজারে ছাড়া হত। সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানো। ছায়ায় বসে বিশ্রাম। বিশেষ গাড়িতে চেপে আসা পর্যটকের অনেক হাঁকডাকের পর খানিকটা সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের সরিয়ে নেওয়া। বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল মাদি চিতাবাঘটি। কিন্তু একদিন সে হারিয়ে গেল। এক মাস পর উদ্ধার হল কঙ্কালসার দেহটি।
বেঙ্গল সাফারির এই ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে কর্তৃপক্ষ। গতবছর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে সুইটি নিখোঁজ ছিল। সেদিন দিনভর এনক্লোজারে থাকার পর রাতে আর ঘরে (ক্রলে) ফেরেনি প্রাণীটি। এক-দু’দিন পেট্রলিং করে খোঁজ করেছিলেন সাফারির কর্মীরা। তারপর হাল ছেড়ে দেন বলেই অভিযোগ।
সাফারি কর্তৃপক্ষের এমন গা-ছাড়া মনোভাবের মাশুল গুনতে হয়েছে সম্বরদেরও। অভিযোগ উঠেছে, বাইরে থেকে বুনোরা অনুপ্রবেশ করে খেয়েছে পার্কের ‘আবাসিক’দের। প্রায় ১০টি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী কোথায় গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি খোদ ডিরেক্টর। নজরদারিতে ফঁাকফোকর ঠিক কতটা বড়, তার প্রমাণ মিলল ডিসেম্বরের শেষদিকে। টহলদারির সময় সুইটির মৃতদেহ খুঁজে পেলেন কর্মীরা।
ময়নাতদন্তের পর নমুনা ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠিয়েছেন পার্কের চিকিৎসকরা। সেই রিপোর্ট এলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে বলে মত কর্তাদের। বেঙ্গল সাফারি পার্কের ডিরেক্টর ই বিজয় কুমারের বক্তব্য, ‘লেপার্ডটি মারা গিয়েছে। কী কারণে মৃত্যু হল, সেটা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরই বোঝা যাবে।’
২০২৩ সালের ১৬ মে কার্সিয়াং ডিভিশনের ঘোষপুকুর রেঞ্জের একটি বাগানে মায়ের মৃতদেহের পাশ থেকে সুইটিকে উদ্ধার করে এনেছিলেন বনকর্মীরা। সাফারিতে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে সে। বড় হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সুইটিকেও লেপার্ড সাফারিতে অন্তর্ভুক্ত করে। সেইমতো নিয়ম করে ক্রল থেকে এনক্লোজারে ছেড়ে দেওয়া হত তাকে। সময়মতো ক্রলে ফিরেও আসত। মাঝে কয়েকবার এক-দু’দিনের জন্য ফেরেনি।
২০২৫ সালের নভেম্বরের সেই দিনও বিকেলের পর ক্রলে না ঢোকায় কর্মীরা ভেবেছিলেন, হয়তো কাল-পরশু সুইটির ফের দেখা মিলবে। তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। খোঁজ শুরু হয়। কয়েকদিনে সেই তল্লাশি থমকেও যায়।
মাসখানেক বাদে লেপার্ড সাফারির এনক্লোজারের জঙ্গল থেকেই সুইটির দেহ মিলেছে। কী কারণে এমন পরিণতি, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সাফারির কর্তাদের প্রাথমিক অনুমান, গাছে উঠতে গিয়ে পড়ে যাওয়ায় মাথায় চোট পেতে পারে সুইটি। নয়তো, অন্য কোনও লেপার্ডের সঙ্গে লড়াইয়ে আহত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এক মাস ধরে একটি লেপার্ড ক্রলে ফিরল না, অথচ কর্তৃপক্ষ উদাসীন রইল কেন- সেই প্রশ্ন উঠছে। দাবি উঠেছে বন দপ্তরের (Forest Division) মাধ্যমে সঠিক তদন্তের।
