পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: নাট্যচর্চায় দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী বালুরঘাট (Balurghat)। সেই পথচলার অন্যতম কারিগর প্রয়াত হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৯ সালে তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় ত্রিতীর্থ নাট্য সংস্থার যাত্রাপথ। এরপর দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে তিনি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন মোট ৭৬টি নাটক। এর মধ্যে ৪৬টি নাটকই তাঁর নিজের কলমে লেখা। জীবদ্দশায় সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি সম্মান ও সাম্মানিক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি মরণোত্তর পদ্মশ্রী প্রাপ্তিতে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর নাম। কিন্তু এই সম্মান কি বালুরঘাটের নাট্যচর্চায় নতুন দিগন্ত খুলে দিল? নতুন প্রজন্মের নাট্যকুশীলবদের কাছে কি তা আশার আলো দেখাবে? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নাট্য মহলে।
প্রয়াত হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের (Harimadhav Mukherjee) হাতে তৈরি ত্রিতীর্থ নাট্য সংস্থার বর্তমান সম্পাদক দুর্গাশংকর সাহা মনে করেন, হরিমাধব নাটকের জগতে এক মহীরুহ। তাঁর মরণোত্তর পদ্মশ্রী প্রাপ্তি নতুন প্রজন্মের কাছে আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব ছবি অন্য রকম।
দল পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি দেখছেন, কে পদ্মশ্রী পেল বা কে পেল না— এতে নতুনদের আগ্রহ বিশেষ নেই। বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে নাট্যচর্চার নতুন প্রজন্ম চরম সংকটে। হরিমাধবের সংস্থায় নতুন মুখ প্রায় দেখাই যায় না। দুর্গাশংকরের কথায়, ‘যাঁরা নাটক করতে চায়, তাঁদের কেউ বিয়েবাড়িতে ফোটোগ্রাফির কাজ করছে, কেউ আবার ডেলিভারি বয়। ভবিষ্যতের চিন্তায় তারা ব্যস্ত। নাটক তাদের আয়ের রাস্তা দেখাতে পারছে না। হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের সময় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পেটের চিন্তা তেমন ছিল না। দিনে চাকরি, সন্ধ্যায় নাট্যচর্চা— এই সুযোগ এখন আর নেই। তাই তাঁর পদ্মশ্রীপ্রাপ্তি নতুনদের নাটকে ফেরাবে বলে আশাবাদী হতে পারছি না।’
দুর্গাশংকরের সঙ্গে একমত ভারতীয় গণনাট্য সংঘের বালুরঘাট শপথ শাখার কর্ণধার হারান মজুমদার। তিনি বলছেন, ‘হরিমাধববাবুর মরণোত্তর পদ্মশ্রীপ্রাপ্তি অবশ্যই গর্বের। তবে এই সম্মানের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নাটকে আসা বা না আসার সরাসরি সম্পর্ক নেই। নাটক একটি দর্শন, যা মতাদর্শের উপর দাঁড়িয়ে। সময় বদলেছে, প্রেক্ষিতও বদলেছে।’
তাই নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টি খুব গুরুত্ব পাবে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর কথায়, ‘এখন নাটকে মানুষ নিজেকে তেমন খুঁজে পায় না। দেবীগর্জন, দেবাংশী, জল বা গ্যালিলিও গ্যালিলির মতো নাটকের সঙ্গে মানুষ একাত্ম হয়েছিল।’
হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের লেখা তিনটি নাটকে নির্দেশনা দিয়েছেন বালুরঘাট সমবেত নাট্যকর্মীর নাট্যকার প্রদোষ মিত্র। তাঁর গলায় শোনা গেল অন্য সুর। তিনি মনে করেন এই পদ্ম সম্মান প্রাপ্তি নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করবে। এতে বালুরঘাটের নাটকের মান আরও উঁচু জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
নতুন প্রজন্ম নাটকের প্রতি আর কতটা আগ্রহী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে হরিমাধবের নিষ্ঠা ও অধ্যাবসায় নতুনদের অনুপ্রাণিত করবেই। এমন আশা বালুরঘাটের নাট্য মহলের।
