প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার: স্কুল আছে, শিক্ষক রয়েছেন, রয়েছে পরিকাঠামোও। কিন্তু নেই পড়ুয়া। নতুন শিক্ষাবর্ষে আলিপুরদুয়ার শহরের একাধিক সরকারি প্রাথমিক স্কুলে (Authorities Main Colleges) পড়ুয়ার অভাবে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। শহরের ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ১০টি স্কুলে প্রাকপ্রাথমিকে নতুন করে কোনও পড়ুয়া ভর্তি হয়নি। কয়েকটি স্কুলে মাত্র একজন করে পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে। ফলে আগামীদিনে এই স্কুলগুলির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
শুধু শহর নয়, জেলার চারটি প্রাথমিক স্কুল ইতিমধ্যে পড়ুয়াশূন্য হয়ে পড়েছে। নতুন করে কেউ ভর্তি না হওয়ায় শিক্ষক মহলেও বাড়ছে চিন্তা। কারণ শহরের বহু স্কুলে বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়ার সংখ্যাই বেশি। তারা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে স্কুল ছেড়ে চলে যাবে। তাই নতুন পড়ুয়া না এলে একাধিক স্কুল কার্যত পড়ুয়াশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির জেলা সম্পাদক প্রসেনজিৎ রায়। তিনি বলেন, ‘যেসব স্কুলে পড়ুয়া দশ-পনেরো জন রয়েছে, সেগুলি এক-দু’বছরের মধ্যেই অচল হয়ে পড়তে পারে। অবিলম্বে স্কুলগুলির পড়ুয়া ভর্তিতে সদর্থক পদক্ষেপ করা হোক।’
বাংলার শিক্ষা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাবর্ষে ইটখোলা শিশু বিদ্যামন্দিরে প্রাকপ্রাথমিকে কোনও পড়ুয়া ভর্তি হয়নি। ওই স্কুলে মোট পড়ুয়ার সংখ্যাও ১৫ জনের কম। নেতাজি শিশু নিকেতনে নতুন ভর্তির তথ্য নেই। জয়ন্তী সমবায় এসসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে। আলিপুরদুয়ার হিন্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুকান্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিবেকানন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একজন করে পড়ুয়া ভর্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, অরবিন্দনগর জিএসএফপি, পিলখানা আরআর প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং স্বামীজি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে কোনও পড়ুয়া ভর্তির তথ্য নেই। বিবেকানন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ছবি। পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্র ৯। এ বছর প্রাকপ্রাথমিকে একজন ছাত্র ভর্তি হয়েছে। অথচ এক সময় এই স্কুলে ৪০ জনের বেশি পড়ুয়া ছিল। সংলগ্ন এলাকায় ইংরেজিমাধ্যম স্কুল চালু হওয়ার পর ২৫ জনের বেশি পড়ুয়া অন্যত্র চলে যায়। শোভাগঞ্জ বিএফপি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে কোনও পড়ুয়া ভর্তি হয়নি বলে অভিযোগ। যদিও এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে কিছু বলতে চায়নি।
তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের একাংশ এই পরিসংখ্যান মানতে নারাজ। তাদের দাবি, নতুন করে পড়ুয়া ভর্তি হয়েছে। কিন্তু এখনও বাংলার শিক্ষা পোর্টালে সেই নাম নথিভুক্ত হয়নি। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক লক্ষ্মণা গোলেকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন না তোলায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন এই দুরবস্থা? অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের জেলা যুগ্ম সম্পাদক সুমন্ত সিংহ দায় চাপিয়েছেন তৃণমূল সরকারের ওপর। তাঁর কথায়, ‘বিগত সরকার শিক্ষার প্রতি উদাসীন ছিল। তাই দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি স্কুলে পড়ুয়া ভর্তি কমে যাচ্ছিল। এছাড়াও একাধিক কর্মকাণ্ডে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা তৈরি করা হয়েছিল।’ তবে তাঁর দাবি, ‘নতুন সরকার আসার পর একাধিক সদর্থক পদক্ষেপ করা হচ্ছে। এতে প্রাথমিকের উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থা সাধারণের কাছে গুরুত্ব পাবে।’
বিশিষ্ট নাগরিক পরিমল দে নিজে প্রায় চল্লিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তিনিও প্রাথমিক শিক্ষার এই হাল নিয়ে চিন্তিত। তাঁর মন্তব্য, ‘কয়েক দশক আগে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে শিক্ষার ভিত তৈরি হয়েছিল।’ পরিমল মনে করেন, শিক্ষার আধুনিকীকরণ ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হলে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের জৌলুস ফিরবে।

