নাগরাকাটা: উত্তরবঙ্গের চা বাগানে অসম মডেল (Assam Mannequin) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। সম্প্রতি শিলিগুড়িতে উত্তরকন্যার প্রশাসনিক বৈঠকে চা বলয়ের সাংসদ ও বিধায়কদের প্রতিবেশী রাজ্যে গিয়ে সবকিছু দেখে আসার নিদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। টি বোর্ডের আধিকারিকদের সঙ্গে পাহাড়, ডুয়ার্স ও তরাইয়ের বিজেপির জনপ্রতিনিধিরা অসমে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। এমন অবস্থায় আশায় বুক বাঁধছেন এখানকার চা শ্রমিকরা।
অসম মডেল ঠিক কী? এর দুটি ভাগ রয়েছে। একটি সরাসরি শ্রমিককল্যাণ সম্পর্কিত, অপরটি চা শিল্পকেন্দ্রিক। শ্রমিককল্যাণ খাতে কেন্দ্রের টাকায় অসমে শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার মান উন্নয়নে বহু কাজ হয়েছে। জোর দেওয়া হয়েছে মূলত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। চা শ্রমিক প্রোৎসাহন যোজনা নামে কেন্দ্রের ওই প্রকল্পটিতে এরাজ্যের জন্য টাকা বরাদ্দ হলেও প্রকল্প রূপায়ণে স্টেট লেভেল কমিটিই গঠন করা হয়নি। আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা বলেন, ‘ওই টাকা পড়ে রয়েছে। আর দেরি না করে সেটা কাজে লাগিয়ে চা শ্রমিকদের পরিস্থিতি শোধরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত সাংসদ ও বিধায়করা অসমে যাব। তার আগে টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারপার্সন সি মুরুগানের সঙ্গে একটি বৈঠক হবে।’
২০২১-’২২ অর্থবর্ষে কেন্দ্রের বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অসম ও উত্তরবঙ্গের চা বাগানের মহিলা ও শিশুদের উন্নয়নে মোট ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করেছিলেন। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রকের মাধ্যমে পরবর্তীতে অসমের জন্য ৬৮৪ কোটি টাকা ও উত্তরবঙ্গের জন্য ৩১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ২০২৪-’২৫ ও ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের মধ্যে ওই টাকা খরচ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তা আরও একবছর বাড়িয়ে ২০২৬-’২৭ করা হয়েছে। অসম সরকার তাদের প্রাপ্ত টাকায় সেখানকার চা বাগানগুলির শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাস, সামাজিক নিরাপত্তার মতো নানা খাতে খরচ করে। উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ডিব্রুগড় চা বাগানে ওয়েলফেয়ার প্রোজেক্ট। স্বাস্থ্যবান শ্রমিক যোজনা নামে গৃহীত আরেকটি খাতে দেওয়ান, জুটলিবাড়ি, মোরান, সেসসা, ঘাগরাজানের মতো কিছু বাছাই করা বাগানে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ইউনিট, শ্রমিকদের দোরে দোরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুরোগ ও পুষ্টি, ডায়াবিটিস ও যক্ষ্মা, মার্তৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, তামাক ও মদের আসক্তি কাটাতে নানা ধরনের কাজ।
শিক্ষার ক্ষেত্রে মূলত জোর দেওয়া হয়েছে চা বাগানের আশপাশের স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, বন্ধ চা বাগানের পড়ুয়াদের আর্থিক সহযোগিতা, অন্যান্য চা বাগানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থার ওপর। আবাস যোজনার ক্ষেত্রে রয়েছে চা শ্রমিকদের বাড়িঘর মেরামতি ও নতুন বাড়ি তৈরি করে দেওয়া, শৌচালয় নির্মাণ, পানীয় জলের ব্যবস্থা। এছাড়াও গর্ভবতীদের এককালীন ১২ হাজার টাকার সহযোগিতা। ভোটের আগে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় অসমে।
মনোজ টিগ্গা বলেন, ‘জমির পূর্ণ অধিকারও সেখানকার চা শ্রমিকরা পেয়েছেন। এটাও এবার আমাদের উত্তরবঙ্গের চা বাগানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হবে।’ উত্তরের চা শ্রমিকদের যৌথ মঞ্চ জয়েন্ট ফোরামের অন্যতম শীর্ষ নেতা জিয়াউল আলম বলেন, ‘পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই। আশা করছি, বর্তমান রাজ্য সরকার চা বাগানে স্কুলছুট, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু রোধ সহ সার্বিক পরিকাঠামো তৈরিতে এগিয়ে আসবে।’ জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সম্পাদক বিজয়গোপাল চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘খোদ মুখ্যমন্ত্রী যেহেতু উদ্যোগ নিয়েছেন, সেকারণে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। বড় বাগানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র চা চাষিদের জন্যও রাজ্য যে ভাববে, সেই বিশ্বাসও রয়েছে।’
