উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী কাণ্ডের জেরে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন টালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক অরূপ বিশ্বাস (Arup Biswas)। ইতিমধ্যেই তাঁর সেই চিঠি ঘিরে বিতর্ক ছড়িয়েছে। চিরকুটের মতো টুকরো কাগজে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘দিদি’ সম্বোধন করে অজস্র ভুল বানানে লেখা চিঠি বর্তমানে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চার বিষয়। প্রশ্ন উঠেছে, যে মন্ত্রী পদত্যাগ করতে চান তিনি ইচ্ছেপ্রকাশ না করে সরাসরি পদত্যাগ করলেন না কেন? এমনকী তাঁর নিজের লেটারহেড থাকলেও বাজারের ফর্দ লেখার মতো করে ভুল বানানে সাদা কাগজে চিঠিই বা কেন পাঠাতে গেলেন? যদিও এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মন্ত্রী নিজে বা তাঁর দল কেউই দেয়নি। দেবেনও না, এটাই ধরে নেওয়া যায়। তবে মন্ত্রীর পদত্যাগের পর থেকে তাঁর দল যেমন এটাকে এক মহান নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তেমনি টালিগঞ্জ এলাকায় মন্ত্রীর অনুগামীরাও ‘দাদা’র হয়ে সরব হয়েছেন। বিভিন্নজন বিভিন্ন লেখায়-পোস্টারে এই পদত্যাগকে ‘দাদা’র ‘আত্মত্যাগ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।
একটি পোস্টারে বলা হয়েছে, ‘১৩ ডিসেম্বরের ঘটনার নিরপেক্ষে তদন্তের স্বার্থে মাননীয় মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পদক্ষেপ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে, ক্ষমতার থেকেও বড় ন্যায়। পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আস্থা। দাদা, আপনাকে জানাই প্রণাম, আপনার কাছ থেকেই শিখেছি, সত্যের পথে চলাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়… তোমার টালিগঞ্জবাসি।’ যদিও ‘টালিগঞ্জবাসি’ বানান ভুল! টালিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বোঝাতে চাইলে লিখতে হত ‘টালিগঞ্জবাসী’। ‘বাসি’ শব্দটা সাধারণত পুরোনো বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তাই বিরোধী শিবিরের কটাক্ষ, যেমন নেতা তেমন তাঁর অনুগামী!
অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগের আগের মুহূর্ত অবধি রাজ্যের ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন— ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ, বিদ্যুৎ এবং আবাসন। এই ৩ টি দপ্তরের মন্ত্রীত্বের মধ্যে তিনি শুধু ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের দায়িত্ব ছেড়েছেন। বিদ্যুৎ এবং আবাসন মন্ত্রীর নাম এখনও অরূপ বিশ্বাস। ফলে, অরূপ ক্রীড়ামন্ত্রী পদে থাকলে যদি ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’, বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই আশঙ্কা কিন্তু এখনও ষোলোআনা বর্তমান। কারণ, তিনি এখনও মমতা-ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। আর কয়েক মাস পরে নির্বাচন ঘোষণা হতে চলেছে। তার আগে ৩টি মন্ত্রীত্বের মধ্যে একটি ‘ত্যাগ’ করে অরূপ বিশ্বাস কতটা ‘মহান’ কাজ করলেন সেই প্রশ্নও উঠছে। তাঁর অনুগামীদের একাংশ এমন প্রচারও চালাচ্ছেন, যে, ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মাঠে অরূপ বিশ্বাস থাকবেন না তো কে থাকবেন? সঙ্গত বক্তব্য। কিন্তু প্রশ্নটা উঠেছে, অরূপের ছবি তোলার জন্য হাঁকপাক করা নিয়ে। যেভাবে তিনি মেসিকে কোমর থেকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছেন তা যথেষ্টই দৃষ্টিকটূ ঠেকেছে। কোনও কোনও ভিডিওতে মেসির নিরাপত্তারক্ষীদের অরূপ বিশ্বাসকে ঠেলে সরিয়ে দিতেও দেখা গেছে। (যদিও কোনও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ।) মাঠে ক্রীড়ামন্ত্রী উপস্থিত থাকলেও তাঁর পরিবারের লোকজনও উপস্থিত থাকার বৈধতা পেয়ে যায় কিনা, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বহু টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মেসিকে একঝলকও দেখতে না পাওয়া হতভাগ্য আমজনতা। দেশের অন্যত্রও মেসি গিয়েছেন, কিন্তু কোথাও মন্ত্রীপর্যায়ের কাউকে এভাবে ছবি তোলার জন্য হামলে পড়তে দেখা যায়নি। ফলে, ইভেন্টের আয়োজক শতদ্রু দত্ত (যাকে রাজ্য সরকার গ্রেপ্তার করেছে) নয়, বরং মানুষের চোখে মূল ভিলেন অরূপই। তৃণমূলও সেটা বিলক্ষণ বোঝে। তাই অরূপের পদত্যাগ মুখ্যমন্ত্রীর ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ, এরপরও অরূপের অনুগামীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে মহান বানানোর চেষ্টায় অক্লান্ত।
