উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: এ এক অদ্ভুত সমাপতন! জীবদ্দশায় যাঁর তৈরি ছবি রাজনৈতিক রোষের মুখে পড়ে সরকারি প্রেক্ষাগৃহ ‘নন্দন’-এ প্রদর্শনের ন্যূনতম সুযোগটুকু পায়নি, মৃত্যুর পর তাঁরই নিথর দেহ শেষ শ্রদ্ধার জন্য শায়িত থাকল সেই চত্বরেই। শুক্রবার সকাল ১০টায় পরিচালক অনীক দত্তর (Anik Dutta) মরদেহ যখন নন্দন (Nandan) প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছাল, তখন উপস্থিত অনুরাগী ও সহকর্মীদের চোখে জল থাকলেও, নেপথ্যে উঁকি দিচ্ছিল একরাশ নীরব প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক তর্জা।
২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল অনীক দত্তর রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’। ছবিটিতে তৎকালীন শাসকের প্রতি তীব্র কটাক্ষের অভিযোগ তুলে কোনো লিখিত নির্দেশ ছাড়াই আচমকা অধিকাংশ হল থেকে তা তুলে নেওয়া হয়। সেই সময় নন্দনেও মেলেনি স্ক্রিনিংয়ের অনুমতি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির নেপথ্য সংগ্রামকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত ‘অপরাজিত’ ছবিটি জাতীয় স্তরে তুমুল প্রশংসিত হলেও, নন্দনে প্রথম দিকে জায়গা পায়নি। পরবর্তীতে দর্শকমহলের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে শো দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালীন নন্দন চত্বরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি টাঙানো নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন স্পষ্টবক্তা অনীক।
সেই নন্দন চত্বরই আজ হয়ে উঠল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর স্রষ্টার শেষ যাত্রার সূচনাপর্ব। কাচের শববাহী গাড়িতে শায়িত অনীকের মরদেহে করজোড়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান টলিপাড়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। বাবার অন্তিম যাত্রার সঙ্গী হন মেয়ে রাই। সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, বিদিপ্তা চট্টোপাধ্যায়দের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব লকেট চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ ও পাপিয়া অধিকারী।
নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে টলিউডের (Tollywood) এই ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “তৃণমূল যে ব্যান কালচার সৃষ্টি করেছিল, তা বর্তমান জমানায় হবে না। শিল্পীর কাজে কোনো রাজনৈতিক রঙ থাকবে না।” অন্যদিকে অভিনেতা ও বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ প্রতিশ্রুতি দেন, পূর্বতন সরকার অনীক দত্তর যে সকল ছবি নন্দনে প্রদর্শনে বাধা দিয়েছিল, বর্তমান সরকার খুব শীঘ্রই সেই ছবিগুলি এখানে দেখানোর ব্যবস্থা করবে।
নন্দন চত্বরে ঘণ্টাখানেক থাকার পর বেলা ১১টা নাগাদ পরিচালকের দেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর আদি কর্মক্ষেত্র এনটি ওয়ান (NT1) স্টুডিওতে। সেখানে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত মরদেহ শায়িত রাখার পর, কেওড়াতলা মহাশ্মশানের উদ্দেশে রওনা দেবে অন্তিমযাত্রা। নন্দন চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা অনুরাগীদের ভিড় আজ যেন নিঃশব্দেই প্রমাণ করে গেল— মানুষ চলে যায়, কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা তাঁর সৃষ্টি ও প্রতিবাদী চেতনা চিরকাল ‘অপরাজিত’ই থেকে যায়।
