অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে (Alipurduar District Hospital) দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে জালিয়াতির (Alipurduar start certificates rip-off) অভিযোগ এবার নতুন মোড় নিল। হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট দুর্নীতি নিয়ে বিধায়ক পরিতোষ দাস এবার নিজেই থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন। এরপর থেকেই শহরে এই দুর্নীতির শেকড় কতদূর পর্যন্ত থাকতে পারে তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন ভুয়ো ডিসচার্জ সার্টিফিকেট তৈরি, লক বুক ও রেজিস্টারে ভুয়ো নাম ঢোকানোর মতো কাজ খুব একটা সহজ নয়। সেই সূত্রেই কেউ কেউ অনুমান করছেন, একটি উদাহরণের সূত্র ধরে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসতে পারে। এই দুর্নীতির তদন্ত ঠিক পথে এগোলে আরও অনেক তথ্য উঠে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ বিভিন্ন নথি বাজেয়াপ্ত করেছে।
আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় এই বিষয়টি সামনে এসেছে। টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট দেওয়া, দালালচক্র চালানোর মতো অভিযোগ আগেও পাওয়া গিয়েছে। এমনকি হাসপাতালে কয়েকজন কর্মী হাসপাতালের বাইরের কিছু অনলাইন ফর্ম ফিলআপের দোকানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সার্টিফিকেট তৈরির চক্র চালাত বলেও অভিযোগ ছিল। আর ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট তৈরির অভিযোগও বহু পুরোনো। তবে এতদিন কোনওকিছুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবার প্রমাণ মিলল একেবারে বিধায়কের হাত ধরে। বিধায়ক এবার একদম নির্দিষ্ট একটি অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।
কয়েকদিন আগে বিধায়ক সারপ্রাইজ ভিজিটে হাসপাতালে হানা দিয়ে দালালচক্রের দুই পান্ডাকে পাকড়াও করেন। মঙ্গলবারও ফের তিনি হাসপাতালের জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র বিভাগে হানা দেন। জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্রের কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে একাধিক অসংগতি তঁার নজরে পড়ে। কোথাও কাটাকুটি, কোথাও হাতের লেখায় গরমিল দেখতে পান। আর তাতেই তঁার সন্দেহ ঘনীভূত হয়। তিনি হাসপাতালে থানার আইসি ও নিজের আইনজীবীকে ডেকে পাঠান। হাসপাতালের সুপারের সামনেই তিনি অভিযোগ করেন, ‘গত কয়েক মাসে অর্থের বিনিময়ে জন্ম-মৃত্যুর একাধিক শংসাপত্র ইস্যু করা হয়েছে।’ তারপরেই পুলিশকে হাসপাতালের জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্রের লগবুক ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করতে অনুরোধ করেন তিনি।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই দুর্নীতির বিষয়টি হাসপাতাল থেকেই কেউ জানিয়েছিল তঁাকে। যদিও তিনি এই বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি তথ্য দিচ্ছেন না। তাঁর কথায়, ‘আমার কাছে কোনও মাধ্যম থেকে ওই অভিযোগ এসেছিল। সেটা যখন সত্যি বেরিয়েছে, তখন এইরকম আরও হতেই পারে।’
হাসপাতাল সূত্রের খবর, এই কারবারে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী জড়িত। এমনকি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর কথাও উঠে আসছে। তাঁর মাধ্যমেও এই কাজ হত। ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট তৈরির ক্ষেত্রে সবাইকে সুযোগ দেওয়া হত না। ওই চক্রে জড়িত হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে বাইরের কয়েকজনের যোগাযোগ ছিল। সেই দালালদের মারফত যোগাযোগ করলে বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি সম্ভব ছিল। সূত্রের খবর, বার্থ সার্টিফিকেট তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্যাকেজ দেওয়া হত। কীভাবে ওই সার্টিফিকেট তৈরি করে দেওয়া হবে সেই তথ্য দেওয়া হত। সেইসঙ্গে আবার সব প্রয়োজনীয় কাগজ জোগাড় করে দেওয়া হত। কাজের বিনিময়ে কত টাকা নেওয়া হবে সেটা ঠিক করা হত। ওই সার্টিফিকেট তৈরি করে দেওয়ার জন্য ১০ থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত টাকা নেওয়া হত বলে অভিযোগ।
যাঁর সার্টিফিকেট তৈরি করতে হবে প্রথমেই তাঁকে থানায় সার্টিফিকেট হারিয়ে গিয়েছে বলে একটি অভিযোগ করতে বলা হত। এরপর সেই অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতালে আবেদন করা হত। প্রয়োজন মতো পাঁচজন সাক্ষীর ঘোষণাপত্র নেওয়া হত। যেখানে বলা থাকে ওই ব্যক্তিরা আবেদনকারীকে চেনেন। এছাড়াও ম্যাজিস্ট্রেটের হলফনামা তৈরি করা হত। এইভাবে যে ভুয়ো সার্টিফিকেট তৈরি হয়েছে সেগুলো সামনে আসতে পারে সঠিক তদন্ত হলে।
অন্যদিকে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar)-২ ব্লকের চণ্ডীরঝাড়ের বাসিন্দা শিবচরণ বর্মনের বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে যে এত জলঘোলা হচ্ছে সেই বিষয়টি শুনে শিবচরণ অবাক। বিধায়ক কেন তাঁর সার্টিফিকেট নিয়ে অভিযোগ করছেন সেটা তিনি জানেন না বলেই জানান। তবে শিবচরণের বয়ানে অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। সার্টিফিকেট হারিয়ে গিয়েছে বলে তিনি পুলিশের কাছে যে অভিযোগ করেছিলেন এক বছর আগে। সেখানে তিনি বলেছেন মহকুমা শাসকের দপ্তরে জাতিগত শংসাপত্র তৈরি করতে আসার সময় তঁার বার্থ সার্টিফিকেট হারিয়ে যায়। এদিন তঁাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি আবার বলেন, ‘আমি একটি চাকরির পরীক্ষার জন্য আবেদন করার জন্য ওই সার্টিফিকেট নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন হারিয়ে যায়।’ শিবচরণের দুই জায়গায় দুই বক্তব্য আরও রহস্য তৈরি করছে।

