ইতিহাস কেবল অতিক্রান্ত সময়ের দলিল নয়, তা একটি জনপদের আত্মপরিচয় ও উত্তরাধিকারের ধারক। আলিপুরদুয়ার মহকুমার দেড়শো বছর পূর্তি হল মঙ্গলবার। অথচ সেই উপলক্ষ্যে কোনও আয়োজন চোখে পড়ল না। নীরবেই যেন ইতিহাসের আরেকটা পাতা পেরিয়ে গেল।
আলিপুরদুয়ার: ১৮৭৬ সালের ৭ জুলাই। মহকুমা হিসেবে পথচলা শুরু করেছিল আলিপুরদুয়ার (Alipurduar)। মঙ্গলবার সেই প্রশাসনিক যাত্রার ১৫০ বছর (150 Years) পূর্তি হল। অথচ এই মাইলফলককে কেন্দ্র করে সরকার কিংবা বেসরকারি সংস্থার তরফে উদ্যোগ নিতে দেখা গেল না। শহরজুড়ে তাই ইতিহাসপ্রেমী এবং সচেতন নাগরিকদের একাংশের প্রশ্ন, এত গৌরবের অধ্যায় কি নীরবতাতেই হারিয়ে যাবে?
জেলা প্রশাসনের এক কর্তা ‘বিষয়টি দেখা হবে’ বলে যেন দায় ঝেড়ে ফেললেন।
১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তির হাত ধরে পশ্চিম ডুয়ার্স ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তারপর থেকে যে প্রশাসনিক বিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা ছিল আলিপুরদুয়ারের আধুনিক পরিচয়ের ভিত্তি। তারপর ১৮৭৬ সালে আলিপুরদুয়ার মহকুমার আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়। মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর একে একে গড়ে ওঠে মহকুমা শাসকের কার্যালয়, সরকারি বাংলো, সার্কিট হাউস সহ একাধিক প্রশাসনিক পরিকাঠামো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকার যোগাযোগ, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। প্রায় ১৩৮ বছর মহকুমা থাকার পর গণআন্দোলনের ফলস্বরূপ ২০১৪ সালে আলিপুরদুয়ার পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এর আগে ১২৫ বছর পূর্তি কিন্তু এমন নীরবে কেটে যায়নি। পুরোনো দিনের সেই স্মৃতিচারণ করলেন প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল দাস। তিনি বললেন, ‘২০০১ সালে একবছর ধরে অনুষ্ঠান চলেছিল। আলিপুরদুয়ার জেলা গঠনের দাবিতে ১ লক্ষ ১৮ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল।’
আলিপুরদুয়ারের প্রবীণ সাহিত্যিক পরিমল দে’র গলাতেও আক্ষেপের সুর স্পষ্ট। তিনি বললেন, ‘এর আগে ১২৫তম মহকুমা দিবসে বিবেকানন্দ কলেজ সংলগ্ন এলাকায় তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। মহকুমাজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। সেই দিনের সঙ্গে এদিনের নিস্তব্ধতার তুলনা করলে তা যথেষ্ট হতাশাজনক।’
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই দেড়শো বছরের মহিমা কি আজ তবে গৌণ? প্রবীণ সাহিত্যিক বললেন, ‘এই প্রজন্মের কাছে আলিপুরদুয়ারের ইতিহাস অনেকটাই অজানা। এমনকি একসময় যে মহকুমা তার গৌরবের শিখরে ছিল, সেই তথ্যও ধূসর হয়ে আসছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আলিপুরদুয়ারকে মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি অন্যতম মাধ্যম হতে পারত এই সার্ধশতবর্ষ উদযাপন।’ একই কথা মনে করছেন আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল দাসও।
২০১৪ সালে আলিপুরদুয়ার পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর কয়েক বছর ধরে জেলার জন্মদিন পালন করা হয়েছে। কিন্তু চলতি বছর সেই ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হয়। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাবেই হয়তো জেলার জন্মদিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যখন জেলার জন্মদিনের কোনও অনুষ্ঠান হল না, তখন মহকুমা শহরের ১৫০ বছর পূর্তিও যে অবহেলিত থাকবে, তা যেন অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক বঙ্গরত্ন প্রমোদ নাথ মনে করিয়ে দিলেন, ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তাই আলিপুরদুয়ারের মতো ঐতিহাসিক জনপদের প্রশাসনিক ইতিহাস যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ ও উদযাপন করা প্রয়োজন।
একদিকে যখন উত্তরবঙ্গের (North Bengal) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে আলিপুরদুয়ারের গুরুত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে তখন তার ইতিহাসকে অস্বীকার করার প্রবণতা জনমানসে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। আলিপুরদুয়ার হেরিটেজ সোসাইটির সম্পাদক শুভময় দত্ত বলেন, ‘আলিপুরদুয়ার মহকুমার ১৫০ বছর পূর্তি একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সেই উপলক্ষ্যে ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, আলোচনা সভা, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী সহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা প্রয়োজন। প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরাও এই উদ্যোগের অংশ হতে চাই। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আলিপুরদুয়ারের গৌরবময় ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।’

