হরি হে! তুমিই মাধব

হরি হে! তুমিই মাধব

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


অতনু গঙ্গোপাধ্যায়

বাবা নীলকান্ত মুখোপাধ্যায় কীর্তন গাইয়ে। গানটাও কিছুদিন শিখেছিলেন নাটকের জন্য। নাটকের জন্য শিখেছিলেন গানের নোটেশন নেওয়া, মঞ্চ সজ্জার প্রকরণ, মেকআপ, পোশাক- আরও অনেককিছুই। কলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন নিজের শহরে নতুন আঙ্গিকের নাটককে দিনাজপুরের মাটিতে বোনার জন্য।

স্বাধীনতার পরবর্তীকালে নাটকের ভাষা পালটে গিয়েছে, তিনিই প্রথম দিনাজপুরিয়া বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন, নাটকের ভাষ্য বদল চাইছে মানুষ। কলকাতার ছাত্রজীবনে একটা সময় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্রের প্রচুর নাটক দেখেছেন। কলকাতার নাটক দেখার আবেশ এবং বাড়িতে কীর্তনের নাট্যসঞ্চার মুহূর্তের প্রভাব হয়তো হরিমাধববাবুর রক্তের অভ্যন্তরের নাটকের বিছন জাগ্রত হয়েছিল। এটা হয়তো সামগ্রিক ইমপ্যাক্ট।

তৃপ্তি মিত্র, কুমার রায়ের জন্মস্থান দিনাজপুরের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অভিধা ছিটকে এসেছিল বালুরঘাটে নাট্যকার মন্মথ রায়ের দেশাত্মবোধক নাটকের হাত ধরে। সেই রিলে রেসের ব্যাটনটা ১৯৬৯ সালেই হস্তান্তর হয়ে গেল ত্রিতীর্থের নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা হরিমাধব মুখোপাধ্যায়ের কাছে। প্রথম নাটক ‘পুতুল খেলা’। নাটক দেখার ও অভিনয় করার দর্শক, অভিনেতাকে তিনি তুলে আনলেন সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে। এমনকি রিকশাওয়ালাকেও তিনি নাটকে অভিনেতা বানিয়েছিলেন।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ত্রিতীর্থের প্রতি আগ্রহ তৈরি হল। এর সঙ্গে যুক্ত হলেন বিভিন্ন জেলা থেকে চাকরিসূত্রে আসা অনেক মানুষ। চালচুলোহীন একটি ছন্নছাড়া দল প্রায় চারটি দশক বালুরঘাট থেকে কলকাতা নিত্যনতুন নাটক প্রদর্শন সঞ্চারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল হরিমাধবের হাত ধরে।

প্রথমদিকে ত্রিতীর্থ কলকাতায় অভিনীত নাটকগুলি করত। তারপর বুঝতে পারলেন নিজস্ব নাটক না হলে কোনও আইডেন্টিটি তৈরি হবে না। নাটককে বোঝার জন্য তখন শেক্সপিয়র, কামু, সার্ত্রে, ভয়েস্কার, বার্নাড শ’ সহ যা পেলেন, তাই পড়েন। এবার শুরু হল নাটক লেখার কাজ। প্রথমে মহাশ্বেতা দেবীর জলের নাট্যরূপ, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্যের গল্প অবলম্বনে মন্ত্রশক্তি নাটকটি লেখেন। মন্ত্রশক্তি নাটকটি উত্তরবঙ্গের তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লিখিত। নাটক পরিচালনা করার পাশাপাশি হরিমাধববাবু একাঙ্ক সহ প্রায় ষাটটি নাটক লিখেছেন। পরিচালনা করেছেন ত্রিতীর্থের প্রায় সব নাটকই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- দেবাংশী, জল, বিছন, দেবীগর্জন, মন্ত্রশুদ্ধি, তিন বিজ্ঞানী, গ্যালিলিও, মঞ্জরী আমের মঞ্জরী।

তাঁর নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হচ্ছে- তিনি একটি স্ট্রিমলাইনার গল্প বলতে ভালোবাসতেন। তাছাড়া গ্রামবাংলার জীবনকে দেখা ও পেশাগত জীবনে অধ্যাপনার সুবাদে তিনি শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে, বালুরঘাটের সাধারণের মানুষের মধ্যে নিবিড় আড্ডার মাধ্যমে কমিউনিকেশন স্কিল তৈরি করেছিলেন। তাঁর নাটকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- শ্রেণিচেতনার দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে দৃঢ় বক্তব্য। এছাড়া নাটকের মুখ্য ক্রমগুলিকে সাজালে দেখা যাবে, অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতার দ্বন্দ্বের আখ্যান। নিজেও অভিনেতা হিসাবে খুবই বলিষ্ঠ ছিলেন। বাংলা নাটকের মঞ্চে একইসঙ্গে তিন ভূমিকায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়-উৎপল দত্ত-বিজন ভট্টাচার্যের সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন ত্রিতীর্থের হরিমাধব।

গল্পকার অভিজিৎ সেনের গল্প নিয়ে ‘দেবাংশী’ নাটকটি করেন। লৌকিক দেবতা বিষহরির ভরে একজন মানুষ দেবাংশী হয়ে যান। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের ভরসাস্থল সেই দেবাংশী। মানুষের মনের ভার লাঘব করতে করতে একসময়ে দেবাংশী নিজের দেবতার ভারকে নিজের থেকে ছিন্ন করেন। উত্তরবঙ্গের সাব-অল্টার্ন মানুষের লৌকিক জীবনের জলছবি এই নাটকটি। সারা বাংলায় এই নাটক আদৃত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর নাটকটিকে পুরস্কৃত করে।

তিনি হিন্দিতে ‘বিছন’ নাটকটি অনুবাদ করেন। বিহারের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে এই হিন্দি নাটকে অনুসরণ করেন। হরিমাধবের পরিচালনায় জল, বিছন, দেবীগর্জন- এই নাটকগুলিতে শ্রেণি চরিত্রের সংঘাত এবং শেষে প্রান্তিক মানুষের জয় দেখিয়েছেন। আমার মনে হয়, হরিমাধব পরিচালিত নাটকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব ছিল। সেকথা প্রখ্যাত নাট্য সমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বীকার করেছেন।

তিনি শুধু বাংলা ভাষাতেই নাটক লেখেননি, রাজবংশী উপভাষায় জল, দেবাংশী, মন্ত্রশক্তি এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী রাজবংশী উপভাষায় নাট্যরূপ দিয়ে অভিনয় করেন। সম্ভবত বাংলা নাটক রচনায় এত ভাষাবৈচিত্র্যে বিজন ভট্টাচার্যর পরে হরিমাধবই একমাত্র নাট্যকার।

মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রাইসিস নিয়ে অনিকেত নাটকটি লেখেন ও নির্দেশনাও দেন। তাঁর কিছু আত্মকথন ও সাক্ষাৎকার দেখে মনে হয়েছে, তিনি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশে নাট্য উপাদান তুলে এনেছেন। নাটককে কখনোই জটিল ফর্মেশন বা শিল্পের ঘূর্ণনের আবর্তে এক্সপেরিমেন্ট করেননি। তাঁর ভাষায়, ‘যে নাটকটা আমি জানি না, বুঝি না, যেটাতে আমার অভিজ্ঞতা নেই, সেটা আমার করা উচিত নয়। আমি কেবলমাত্র আমার অভিজ্ঞতাকে মেলে ধরতে পারি।’ সেইজন্যই দ্বান্দ্বিক সরল নিয়মের নাটককে নিয়েও একটি অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নাট্যপ্রাণ দল গড়ে বালুরঘাট এবং জেলা ছাড়িয়ে বাংলার নাট্যজগতে ত্রিতীর্থের অভিঘাতকে স্পষ্ট করে তুলতে একমাত্র হরিমাধবই পেরেছিলেন।

দক্ষিণ দিনাজপুরের নাট্য আন্দোলনের হরিমাধবের প্রভাবে ও বৈপরীত্যে অনেক সহায়ক নাট্যদল গড়ে ওঠে। নাটকের জগতে অবদানের জন্য তিনি দিশারি, সংগীত-নাটক অ্যাকাডেমি সহ প্রচুর পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর প্রায় পঞ্চান্ন বছর সক্রিয় নাট্যচর্চার ফসলে বালুরঘাটবাসীরা বাংলার যে কোনও সাংস্কৃতিক মহলে কিঞ্চিৎ বেশিই সমাদর পান।

যখন খবর এল, হরিমাধব আর নেই, সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে তাঁর হাসিমুখ ছবি আর ছবি। সবাই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন, কারণ ত্রিতীর্থের নাটক না দেখে বড় হয়নি এমন তরুণ-তরুণীরা আজ মধ্যবয়সি। বালুরঘাটে এসে নাটক করে গিয়েছে দেশের সব প্রান্তের নাট্যদল। সবাই একবার হলেও ছুঁয়ে গিয়েছেন হরিমাধবকে।

হরিমাধব চলে যাওয়ায় চিত্তহরণ করার মাধব অর্থাৎ মধু যে আজ ফুরিয়ে গেল। বালুরঘাটের নাট্যমৌচাকের মৌতাত আর কি জমবে? হরিমাধব যে সময়ে চলে গেলেন, তখন নাট্যশিল্প বিপন্ন। এবং অনেক পারিপার্শ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ত্রিতীর্থের গোবিন্দ অঙ্গনে আবার হয়তো নতুন নাটকের মহলা জমবে, কিন্তু সন্ধের মহলায় সেই শালপ্রাংশু মানুষটি এসে নবীন অভিনেতার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়াবেন না।

ত্রিভুজের তিন বাহুকে একটি অমানুষিক দক্ষতায়, নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতার তিনটে তীর্থকে একই তানে একই সুরে বেঁধে রেখেছিলেন যে মানুষটি, তিনিও আজ পর্দার ওপারে।

বাংলা নাট্যজগতের ইতিহাস একসময়ে বলবে, তারকাসমৃদ্ধ কলকাতার পাশাপাশি উত্তরেও কিছু তারা ছিল।

(লেখক বালুরঘাটের প্রাবন্ধিক, নাট্যসমালোচক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *