নির্বাচন কমিশনের প্রচারে সবসময় বলা হয়, ভোটদানের হার যত বেশি হবে, তত গণতন্ত্রের হাত শক্ত হবে। নির্ভয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোটদান, ভোট প্রক্রিয়া অবাধ ও নিরপেক্ষ করার দায়িত্ব পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের। অথচ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) প্রক্রিয়া দেখে কিন্তু স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যাঁদের ভোটে গণতন্ত্র মজবুত হয়, সেই সাধারণ মানুষকে শুনানির নামে হয়রানি করার অভিযোগ উঠছে। লজিস্টিক ডিসক্রিপেন্সির নামে শুনানিতে ডাকায় সেই অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে। ভারতকে গণতন্ত্রের জননী বলে থাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ভোটারদের সন্দেহের চোখে দেখা হলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জাজনক বৈকি।
ভোটার তালিকাকে অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত করা দরকার। অবৈধ ভোটারের তালিকায় ঠাঁই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেই যুক্তিতে জীবিত মানুষকে মৃত বলে দেখিয়ে দিলে কিংবা পারিবারিক তথ্যের মিল নেই কেন প্রশ্ন তুলে ভোটারের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হলে তা নিঃসন্দেহে চিন্তার কথা। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর শুরুর পর বহু সাধারণ মানুষ মারা গিয়েছেন। বাংলাদেশি সন্দেহে তাঁদের ভারত থেকে বের করে দেওয়া হবে- এই আতঙ্কে অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আবার নির্বাচন কমিশনের নিত্যনতুন ফরমানের চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক বিএলও আত্মঘাতী হয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি যেসব রাজ্যে এসআইআর চলছে সেখানেও বিএলও-দের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গিয়েছে। এত মৃত্যু নিয়ে নির্বাচন কমিশন কিন্তু ভাবলেশহীন। অতীতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারদের নাম মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন। জ্ঞানেশ কুমারের আমলে সেই সুনাম হারিয়ে যাচ্ছে।
ভোট চুরি, ভোটার তালিকায় গরমিল, বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত ইত্যাদি অভিযোগে কমিশনকে ঘিরে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এসআইআর-এর শুনানিতে হয়রানি বাড়তে থাকায় কমিশনের বিরুদ্ধে গণরোষ ক্রমশ বাড়ছে। ফরাক্কা, চাকুলিয়ার অশান্তি সেই রোষের বহিঃপ্রকাশ। এটা ঠিকই যে, হিংসা, অশান্তি কখনও বরদাস্ত করা যায় না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিত্যনতুন নিদানে সাধারণ মানুষের হতাশা, আশঙ্কা, বিরক্তি, ক্ষোভকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
কমিশনের নতুন নিয়মে মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড আর এসআইআর-এর বৈধ নথি নয়। এই ঘোষণার পর এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশন খামখেয়ালির অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছে। এলাকা বেছে নোটিশ পাঠানোর অভিযোগও আছে। এতে বিভ্রান্তি বাড়ছে। অথচ নির্বাচন কমিশন নির্বিকার। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে, যেখানে বহু পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছোয়নি, আর্থিক বৈষম্য ভয়াবহ, দু’বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়া যেখানে স্বপ্ন, মাথার ওপর ছাদটুকুও যেখানে পাওয়া যায় না, সেই দেশে এই পরিস্থিতি নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকার আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।
ভোটার তালিকা, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড ইত্যাদি নথিতে নামধাম, বাবা বা স্বামীর নাম, বয়স, লিঙ্গের মতো ভুল সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় করেন না। কমিশনের মতো যে সমস্ত সংস্থা নথিগুলি তৈরি করে, তাদের গাফিলতির কারণেই ভুল থেকে যায়। অথচ এই ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এসআইআর-এ ২০০২ সালের যে তালিকাকে নির্বাচন কমিশন মানদণ্ড বলে চিহ্নিত করেছে, সেখানে কোনও ভুল থেকে থাকলে তার দায় কমিশনেরই।
কিন্তু কমিশন সেই ভুল স্বীকার করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে মুখে কুলুপ এঁটে মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ফলে নোটবন্দি থেকে এসআইআর-এ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে আমজনতার হয়রানির ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। শুধু রূপভেদ হয়েছে, কিন্তু চরিত্রগত কোনও পরিবর্তন হয়নি। গণতান্ত্রিক দেশে এই ঘটনা লজ্জাজনক বৈকি।
