সুমন ভট্টাচার্য
আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজের সিনিয়ার, অচ্যুত মণ্ডল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের যশস্বী অধ্যাপক, যিনি অকালে মারা যান, তাঁর কবিতার বিখ্যাত লাইন ছিল ‘অটোতে চড়ে চাঁদে যাব’। অচ্যুতদা দেখে যেতে পারলেন না, সত্যিই হয়তো চাঁদে যাওয়াটা অটোয় চড়ার মতোই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমার মেয়ে মাইক্রো বায়োলজি নিয়ে পড়ার পর আর ভারতবর্ষে কোনও সম্পত্তির খোঁজ করছে না। যদি ভাবেন দুবাই বা লন্ডনে ফ্ল্যাট কিনবেন বলে ভাবছেন, তাহলে ভুল। এই প্রজন্মের নাকি পছন্দ চাঁদে জমি কেনা। যদিও চাঁদে জমি কেনার এখনও অবধি কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু চাঁদে যে শিগগিরই মোবাইলের কানেকশন হয়ে যাবে, এমনটা কিন্তু বেশ কিছু মার্কিন সংস্থা দাবি করছে।
মাস্কের কীর্তি
কন্সপিরেসি থিওরিকে বাদ দিলেও এক সময় চাঁদে মানুষের পদচিহ্ন পড়া ছিল সত্যি সত্যি রাষ্ট্রীয় গৌরবের প্রতীক। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকার যে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’, সামরিক যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত যুদ্ধ চলছিল, সেখানে ইউরি গ্যাগারিন যদি মহাকাশে পৌঁছোনো প্রথম মানুষ হন, তাহলে চাঁদে পৌঁছে গিয়েছিলেন আমেরিকা থেকে নীল আর্মস্ট্রং। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে চাঁদ বা মহাকাশ আর কোনও সভ্যতার বা কল্পনার বিষয় নয়; বরং পয়সা থাকলে আপনি মহাকাশে ঘুরতে যেতে পারবেন। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আগে রিচার্ড ব্রনসন দেখিয়েছিলেন ধনকুবেরদের বাসনা বা বিলাস হওয়া উচিত মহাকাশে ঘুরতে যাওয়া। আর এই যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সবসময় এঁটুলির মতো লেগে থাকা, আসলে কিছুদিন আগে অবধি লেগেছিলেন, আবার বিদ্রোহ করেছিলেন, আবার এখন তাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে, সেই এলন মাস্কেরও কিন্তু যাবতীয় মাথাব্যথা মহাকাশে লোক পাঠানো নিয়ে। এলন মাস্কের ‘স্পেস এক্স’ এখন তাঁর নিজের ‘পোর্টফোলিও’তে সবচেয়ে দামি সংস্থা। ইলেক্ট্রিক ভেহিকলের জন্য পরিচিত টেসলাকে ছাপিয়ে গেছে মাস্কের ‘স্পেস এক্স’-এর শেয়ার দর। তাই মাস্ক ‘স্পেস এক্স’কে নিয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর ট্রাম্পও যখন এলন মাস্ক বিদ্রোহী হয়েছিলেন, তখন হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন, যে মার্কিন রাষ্ট্র, অর্থাৎ, তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি অর্থ আর এলন মাস্ককে ভরতুকি হিসেবে দেওয়া হবে না, অথবা তাঁর ‘স্টারলিংক’, ‘স্পেস এক্স’কে সরকারি অনুমোদনও না দেওয়া হতে পারে। হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই হুমকির পরই যাবতীয় বিরোধিতা সত্ত্বেও এলন মাস্ককে আবার হোয়াইট হাউস অথবা লামাগায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে।
বহু খেলোয়াড়
প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে মহাকাশ, চাঁদ এমনকি মঙ্গল গ্রহ— এগুলি কি হাতের নাগালের মধ্যে চলে এল? শিগগিরই কি চাঁদে বেড়াতে যাওয়া যাবে পুজোর ছুটিতে? কিংবা ক্রিসমাসে মহাকাশ অভিযান? হয়তো কিছুটা মজার শোনালেও প্রযুক্তিগত কারণে এবং খরচ অনেক কমে যাওয়াতে মহাকাশে যাওয়াটা আর এখন দুঃসাধ্য বিষয় নয়। পয়সা থাকলেই যে মহাকাশে যাওয়া যায়, সেটা রিচার্ড ব্রনসন দেখিয়েছিলেন এবং এখন মার্কিন মুলুকের দুই সংস্থা এলন মাস্কের ‘স্পেস এক্স’ আর জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’— দুটিই মহাকাশ পর্যটন কিন্তু শুরু করাতে চলেছে। কিন্তু শুধুমাত্র ধনকুবেরদের জন্য মহাকাশ পর্যটন নাকি আরও একটু বেশি মহাকাশকে নিয়ে ভাবা হচ্ছে?
গোল্ডেন ডোম
আসলে রকেট এখন আর শুধু গবেষণার বিষয়বস্তু নয়। মহাকাশও শুধুমাত্র কবির কল্পনা নয়। মহাকাশে নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে যে অনেক কিছু করা যায়, সেটা আমেরিকা প্রতিপদে দেখিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন কনক্লেভে এসে বিখ্যাত অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ সৌরভ মুখোপাধ্যায় একটি চমৎকার কথা বলেছেন। বলেছেন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি অর্থাৎ, ‘মেটা’ হোক কিংবা নাম বদলে ফেলা ‘এক্স’ অথবা অন্য যে কোনও সংস্থা, যেমন গুগল বা মাইক্রোসফট, এই সবক’টিই যেহেতু আমেরিকায় অবস্থিত, তাই তার যে পুঁজি বা তার যে ক্ষমতা, সেটার জোরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীতে এরকম যথেচ্ছাচার করে বেড়াতে পারছেন। মহাকাশের ক্ষেত্রেও সেটা খানিকটা সত্যি। মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন সংস্থার হাতে। এমন নয় যে, চিন টক্কর দেওয়ার কথা ভাবছে না! চিনও বলছে যে, ২০৩০-এর মধ্যে মহাকাশ গবেষণায় বা চাঁদে লোক পাঠানোয় তারা অনেকটা এগিয়ে যাবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অ্যাডভান্টেজ আমেরিকার আর যার পুরোপুরি সুফল তুলছেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। আবার তিনি ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্পটিকে ফিরিয়ে এনেছেন, অর্থাৎ, যা মহাকাশ থেকে এমন এক চাদর তৈরি করবে যে চাদর বিশাল আমেরিকাকে রক্ষা করবে যে কোনও ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা বিমান হামলার থেকে। তাহলে আবার মহাকাশ শুধুমাত্র সামরিক নয়, বাণিজ্যিক কাজেও জোরকদমে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে এগিয়ে এসেছে।
বিপুল বিনিয়োগ
আমি ‘কোম্পানি’ শব্দটি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম, কারণ, আমেরিকায় এখন অনেক সংস্থাই, এমনকি অনেক নতুন স্টার্ট আপ সংস্থাও মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে বা মহাকাশের বিষয়ে পরিকল্পনা করছে এবং তাদের পিছনে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগও হচ্ছে। কেন এই বিনিয়োগ? এই প্রশ্নটা বোঝার জন্য খুব গবেষণার প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতবর্ষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যখন ট্রাম্পের চাপে ভারত সরকার এলন মাস্কের বাড়ির মালিকানাধীন ‘স্টারলিংক’-এর সঙ্গে চুক্তি সই করে। সেই চুক্তিটি আসলে ভারতবর্ষের মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবসার উপর ‘স্টারলিংক’-এর নিয়ন্ত্রণকে একেবারে প্রতিস্থাপিত করে দেয়। ভারতবর্ষের সমস্ত মোবাইল কোম্পানি এয়ারটেল থেকে জিও ‘স্টারলিংক’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে নেয়। তার মানে কী? তার মানে হচ্ছে যে, এবার থেকে ‘স্টারলিংক’-এর স্যাটেলাইট ব্যবহার হবে ভারতবর্ষের মোবাইল পরিষেবার জন্য। এতে যেমন ভারতের বাজারে ‘স্টারলিংক’-এর দখলদারি বাড়বে, তেমনই ভারতীয় ক্রেতাদের সম্পর্কে সমস্ত তথ্য এলন মাস্কের কোম্পানির কাছে থাকবে। কিন্তু এ তো গেল শুধু ব্যবসার কথা। ব্যবসার পাশাপাশি যদি অন্যদিকে ভাবি, তাহলে বুঝতে হবে যে, মহাকাশকে ব্যবহার করে অর্থাৎ, প্রযুক্তিগতভাবে উপগ্রহকে ব্যবহার করে এখন অনেকটাই ব্যবসা করা সম্ভব। বিশেষ করে, ‘স্যাটেলাইট ডেটা’ বা ‘স্মল স্যাটেলাইট’ হাতে থাকলে আবহাওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দেওয়া সম্ভব।
বাস্তবের পথে
পরিস্থিতি যেমনভাবে এগোচ্ছে, তাতে চাঁদে ঘুরতে যাওয়াটা বোধহয় খুব দূরের বিষয় নয়। কিন্তু সত্যি সত্যি কি চাঁদ থেকে খনিজ পদার্থ উত্তোলন করা যাবে বা চাঁদের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করা যাবে পৃথিবীর স্বার্থে? এখনও নিশ্চিত নয় কারণ, চাঁদের মালিকানা কার হাতে থাকবে, সেই বিষয়টি নিয়ে এখনও অবধি কোনও রাষ্ট্রই, এমনকি রাষ্ট্রসংঘও কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারেনি। যদিও চাঁদের জমি প্রতীকী অর্থে বিক্রি শুরু হয়ে গেছে ‘সী অফ ট্রাঙ্কুইলিটি’ বা ‘লুনার আল্পস’, অর্থাৎ, চাঁদের যেটা আল্পস পাহাড় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে নাকি জমি কেনাটা ভালো এবং প্রতীকী অর্থে অনেকেই সেই জমি কিনছেও। এইটুকু পরিষ্কার, যে অচ্যুতদা হয়তো দেখে যেতে পারলেন না, কিন্তু অটোতে না চড়ে হলেও রকেটে চড়ে চাঁদে যাওয়া যাবে এবং ফিরে এসে আবার দেশে এসে গল্প বলার দিনও আর খুব দূরে নেই।
(লেখক সাংবাদিক)
