- দীপঙ্কর হালদার
হিমালয়ের কোলে একটি ছোট্ট গ্রাম, যেখানে রাত নামলে মনে হয় যেন স্বর্গ নেমে এসেছে মর্ত্যে। শহর-জীবনের কৃত্রিম আলোর দূষণ থেকে বহুদূরে, প্রকৃতির দেওয়া এক অমূল্য সম্পদকে বুকে আগলে রেখেছে হানলে (Hanle)। লাদাখের এই গ্রামটি এখন আর শুধু যাযাবরদের বাসস্থান নয়, বরং ভারতের প্রথম ‘ডার্ক স্কাই রিজার্ভ’। জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাচীনতম বিজ্ঞানকে এখানে যেন নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে। এখানকার আকাশ বিশ্বের অন্যতম অন্ধকার আকাশ হিসাবে স্বীকৃত— বর্টল-১ স্কেলে এটি সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার রেটিং, যা প্রমাণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান আসলে সবার জন্য।
হানলের এই আকাশকে রক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (আইআইএ), লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং লেহ-এর লাদাখ হিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল। তাদের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তি বা বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই এলাকাটিকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নয়, বরং সরকার-সমর্থিত ও বিজ্ঞান-চালিত এক টেকসই উন্নয়নের মডেল। এই ডার্ক স্কাই রিজার্ভটি চ্যাংথাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ভেতরে অবস্থিত, যা আইআইএ পরিচালিত ইন্ডিয়ান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিকে ঘিরে রয়েছে।
টেলিস্কোপে মহাজাগতিক রহস্য
হানলের আবহাওয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ। এই অবজার্ভেটরির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার দোর্জে আংচুক বললেন, ‘অসংখ্য পরিষ্কার রাতের আকাশ, মহাজাগতিক বস্তুর আলো শোষণ করার মতো বায়ুমণ্ডলীয় কণার অভাব এবং কম আলোর দূষণ হানলেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ স্থান করে তুলেছে।’ এই মানমন্দিরে দুটি অপটিকাল টেলিস্কোপ রয়েছে : হিমালয়ান চন্দ্র টেলিস্কোপ এবং গ্রোথ ইন্ডিয়া টেলিস্কোপ। এছাড়া রয়েছে দুটি চেরেঙ্কভ টেলিস্কোপও, যা মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করে।
ডার্ক স্কাই রিজার্ভের মূল মন্ত্রই হল আলোর দূষণ কমানো। এই লক্ষ্যে আইআইএ গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ও পরিকাঠামোতে ল্যাম্পশেড, ব্ল্যাকআউট পর্দা এবং উষ্ণ টোনের বালব বিতরণ করেছে। এর ফলে গ্রামের নিজস্ব জীবনযাত্রা ঠিক রেখেই আকাশকে অন্ধকার রাখা সম্ভব হয়েছে।
‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাম্বাসাডর’ ও স্থানীয় অর্থনীতি
এই বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ এখন হানলের স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজম বা জ্যোতির্বিজ্ঞান-পর্যটনকে উৎসাহিত করতে আইআইএ ২৫ জন স্থানীয় তরুণ–তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাম্বাসাডর’ তৈরি করেছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনই মহিলা। তাঁদের টেলিস্কোপের ব্যবহার ও প্রাথমিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারণাগুলি শেখানো হয়েছে। পর্যটকদের জন্য রাতের আকাশের যে ট্যুর এরা পরিচালনা করে, তা তাঁদের আংশিক আয়ের উৎস।
২০২২ সাল থেকে অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কাজ করা রাংডোল দোর্জে জানান, পর্যটকদের আগমনের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। অ্যাকাউন্টেন্সির ছাত্রী শেরিং স্কিটজোম যিনি সদ্য অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাম্বাসাডর হয়েছেন, মনে করেন তাঁদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা বাইরের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দোর্জে’র কথায়, ‘সত্যি বলতে, হানলেতে জন্ম নেওয়া আমার জন্য সৌভাগ্যের।’ হানলের মতো গ্রাম প্রমাণ করে, জ্যোতির্বিজ্ঞান সবার জন্য।
‘স্টার পার্টি’ : নক্ষত্রপ্রেমীদের মিলনমেলা
২০২৩ সাল থেকে হানলে ডার্ক স্কাই রিজার্ভে বার্ষিক ‘স্টার পার্টি’ আয়োজিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হল এর তৃতীয় সংস্করণ। এটি এমন এক বিশেষ সমাবেশ, যেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎসাহী মানুষ, অ্যাস্ট্রোফোটোগ্রাফার এবং সাধারণ মানুষ এক ছাদের নীচে এসে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ ও উদযাপন করেন। এটি শিক্ষাদান, ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন এবং একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার এক দারুণ ক্ষেত্র তৈরি করে।
এই স্টার পার্টিগুলি চিরাচরিত পার্টির মতো নয়। এটি অন্ধকার আকাশের নীচে বসে, সাদা আলো এবং তীব্র শব্দ থেকে মুক্ত এক শান্ত পর্যবেক্ষণ সভা। এবছরের পার্টিতে নক্ষত্রপ্রেমী এবং পেশাদার মিলিয়ে প্রায় ৪৭ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। সূর্যাস্তের পরে বক্তৃতা ও টিউটোরিয়াল চলত, যেখানে পরিষ্কার আকাশের সুবিধাগুলি কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা শেখানো হত। রাতের বেলা চলত মহাজগতের দৃশ্য দেখা ও তার ছবি তোলার পালা।
দুষ্প্রাপ্য মহাজাগতিক দৃশ্য
গুজরাটের অপের্চার টেলিস্কোপ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী অজয় তলোয়ার বলেন, ‘হানলের আকাশ এতটাই দূষণমুক্ত যে, এখানে এমন অনেক দুষ্প্রাপ্য ও একচেটিয়া ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা যায়, যা আর কোথাও দেখা যায় না।’ এই দুষ্প্রাপ্য ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম হল জোডিয়াকাল লাইট। এটি হল সূর্যালোক যখন সৌরজগতের ভেতরের ধূলিকণার উপর পড়ে, তখন এক ক্ষীণ আভা তৈরি হয়। এটিকে ‘কেবল হানলে থেকেই দেখা যায়’ বলে অজয় তলোয়ার মনে করেন। এছাড়াও তিনি পার্টিতে গেগেনশাইন (যা সূর্যের ঠিক বিপরীতে আকাশে দেখা যায়) এবং বেল্ট অফ ভেনাসের (যা সন্ধ্যার আকাশে এক গোলাপি আলোর ব্যান্ড) মতো ঘটনার ব্যাখ্যা করেন এবং সেগুলি দেখার সেরা সময় সম্পর্কে আলোচনা করেন। এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মী এবং অ্যামেচার অ্যাস্ট্রোনমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ নিউ দিল্লির সদস্য নীলম তলোয়ার প্রতি বছর পরিষ্কার আকাশ এবং শান্ত আবহাওয়ার টানে এখানে ফিরে আসেন বলে জানান।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রস্তুতি
তবে হানলের পরিবেশ মানুষের শরীরের জন্য ততটা সুবিধাজনক নয়। এখানে অক্সিজেনের মাত্রা কম, আর্দ্রতা কম এবং অতিবেগুনি বিকিরণ বেশি। অজয় তলোয়ার সতর্ক করে বলেন, ‘এখানে প্রচুর পরিকল্পনা এবং বিশ্রাম নিয়ে আসা খুব জরুরি।’ আইআইএ তাই স্টার পার্টির অংশগ্রহণকারীদের হানলে যাওয়ার অন্তত দুইদিন আগে লেহ-এ এসে নিজেদের ঠিকমতো প্রস্ততি করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। উচ্চ উচ্চতায় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা এড়াতে সবার মেডিকেল চেকআপ বাধ্যতামূলক ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হানলেতেও রাতে মেডিকেল চেকআপ ও স্বেচ্ছাসেবকদের উপস্থিতি ছিল।
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাম্বাসাডর পদ্মা ইশে স্কুলে পড়ুয়া স্থানীয় শিশুদের বিকল্প শিক্ষা কোর্স শেখান। সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মিশেলে জ্ঞান দেওয়া হয়। তিনি মনে করেন, নিজেদের সংস্কৃতি ভালোভাবে জানলে তরুণ শিক্ষার্থীরা আরও ভালো গবেষণা করবে। ইশে এবং শিক্ষাবিদ অনমোল টিকু স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে রাতের আকাশ সম্পর্কিত গল্প, প্রবাদ ও লোকসংগীত সংগ্রহ করে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষণের কাজ করছেন। জম্মু ও কাশ্মীর-এর শিক্ষক মুনিব ওয়ানি তরুণদের প্রকৌশল ও চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইরে মহাকাশ বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে কর্মজীবনের সম্ভাবনা খুঁজে দেখতে উৎসাহিত করেন। হরিয়ানার জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষাবিদ রশ্মি শিউরন জানান, স্টার পার্টিতে এসে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে নিজের চোখে গ্রহগুলি দেখার পর তাঁর ধারণা বদলে যায়। তিনি মনে করেন সেই দৃশ্য ইন্টারনেটের ছবির চেয়েও ভালো বা অন্তত সমমানের। পার্টির শেষ রাতে অংশগ্রহণকারীরা পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য উন্মুক্ত আকাশের পর্যবেক্ষণের আয়োজন করেন। প্রায় ৩০০ জন মানুষ এতে যোগ দেন, যাদের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরাও ছিলেন। দোর্জে আংচুক জানান, অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমকে আরও উৎসাহ দিতে তাঁরা রিজার্ভের কাছে একটি মিনি-প্ল্যানেটোরিয়াম তৈরি করছেন। এছাড়া তীব্র শীতকালে পর্যটক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য ‘অ্যাস্ট্রোগ্লোব’ নামক একটি স্বচ্ছ গম্বুজ তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।
‘পাহাড় দেখতে আসুন, নক্ষত্রের জন্য থেকে যান’— এই স্লোগানকে সামনে রেখে হানলে ডার্ক স্কাই রিজার্ভ প্রমাণ করছে কীভাবে হিমালয়ের আকাশকে বর্তমান প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও এক সহায়ক হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
