তৃণমূলের প্রার্থীতালিকায় বড় কোনও চমক নেই। তবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে জেলায় জেলায় তুলনায় নবীন ও নতুনদের সামনে আনার পরিকল্পনা স্পষ্ট। জিতে জনপ্রতিনিধি হলে তাঁদের হাতে সাংগঠনিক ব্যাটন তুলে দেওয়ার এই ছকের পিছনে দলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ভাবনা আছে। যদি তাঁদের কেউ কেউ হেরেও যান, তবু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত করার সুযোগ থেকে গেল। তাই বলে অবশ্য পুরোনো কিন্তু অভিজ্ঞ সবাইকে ঝেড়ে ফেললেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কোচবিহার জেলায় তুলনায় নবীন মুখের বড় প্রমাণ সাবলু বর্মন। যাঁকে মাথাভাঙ্গা কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অন্যতম সেনাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষকে কিন্তু নাটাবাড়ি কেন্দ্রে আর মনোনয়ন দেওয়া হল না। বরং দলে কাজ করার নিরিখে নবীন শৈলেন বর্মাকে ওই কেন্দ্রে প্রার্থী করা হল। বাদ পড়লেন দলের দীর্ঘদিনের নেতা আবদুল জলিল আহমেদ ও গিরীন্দ্রনাথ বর্মন।
বাদের তালিকায় চলে গেলেন আলিপুরদুয়ারের মৃদুল গোস্বামী, সৌরভ চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ কর, জলপাইগুড়ি জেলার খগেশ্বর রায়, চন্দন ভৌমিক, মহুয়া গোপ, উত্তর দিনাজপুরের আবদুল করিম চৌধুরী, মালদার কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী, সাবিত্রী মিত্রদের মতো বহু পুরোনো নেতা। কিন্তু রতুয়ার সমর মুখোপাধ্যায়, কলকাতার ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, মদন মিত্র, এমনকি বর্ষীয়ান শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার অশোক দেব পর্যন্ত প্রার্থীতালিকায় স্থান পেয়েছেন।
কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাংশু ভট্টাচার্য, তন্ময় ঘোষরা মনোনয়ন পেয়েছেন। উত্তরবঙ্গে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবার বোড়ে বানালেন অভিজিৎ দে ভৌমিক, পার্থপ্রতিম রায়, সুমন কাঞ্জিলাল, রামমোহন রায়, কৃষ্ণ দাস, কানাইয়ালাল আগরওয়ালদের। যাঁরা দলের দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় স্তরের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। নন্দীগ্রামে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিপরীতে পরিষদীয় রাজনীতিতে নতুন মুখ, বয়সে নবীন পবিত্র করকে তুলে আনা হয়েছে। যিনি বিজেপিতেও সাংগঠনিক নেতা হিসেবে নিজের ঠাঁই করে নিয়েছিলেন।
তালিকা দেখলে বোঝা যাবে যে পুরোনো ও প্রবীণদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের আর দলের ক্ষতি করারও তেমন সামর্থ্য নেই। তুলনায় নবীনও একদল কর্মী তৃণমূলের প্রার্থীতালিকায় নেই বটে। কিন্তু তাঁদেরও দলের বিরুদ্ধে যাওয়া কঠিন। গেলেও তাতে তেমন দাগ কাটতে পারবেন না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তালিকাটি তৈরিতে মস্তিষ্ক মূলত দুজনের- মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক অবশ্যই ছিল এই পরিকল্পনায়। শেষপর্যন্ত স্পষ্ট হল যে, তালিকাটি নিছক কেন্দ্রওয়াড়ি প্রার্থীদের নাম নয়। এর পিছনে রয়েছে তৃণমূলের সাংগঠনিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একথাও অনস্বীকার্য যে, দল আবার সরকারে এলে সেই পরিকল্পনা যত সহজে বাস্তবায়িত হবে, হেরে গেলে কাজটা ততটা মসৃণ হবে না। ২০১১-তে পরাজয়ের পর জেলায় জেলায় সিপিএমের সংগঠন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল।
বিধানসভা নির্বাচনে তুলনায় নবীন ও নতুন মুখকে মনোনয়ন দিয়ে তৃণমূল অন্তত সেরকম বিপর্যয় ঠেকানোর আগাম পদক্ষেপ করে রাখল। এটা ঠিকই যে, ২০২৬-এর ভোট তৃণমূলের পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিজেপি দলগতভাবে সমস্ত শক্তি দিয়ে এই নির্বাচন লড়তে নেমেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের একের পর এক পদক্ষেপ সেই শক্তিতে আরও সাহায্য করছে। মূলত ত্রিশক্তির চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলার শাসকদল।
এর বাইরে আছে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলবিরোধী তীব্র অসন্তোষ। স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতির যে রাজ গত কয়েক বছরে বাংলায় প্রতিষ্ঠা করেছে তৃণমূল- তা থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া জনসাধারণের একাংশ। যাঁদের কেউ কেউ পছন্দ না করলেও তৃণমূলের ওপর ক্ষোভে পদ্ম প্রতীকে ভোট দিতে প্রস্তুত হয়ে আছেন। এতরকম প্রতিবন্ধকতার মুখে কিন্তু মমতা-অভিষেকের প্রার্থীতালিকায় ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা পরের কথা।
The put up সুপরিকল্পিত appeared first on Uttarbanga Sambad.
