সুন্দরী কমলার ভোটের নাচন

সুন্দরী কমলার ভোটের নাচন

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


ইতিহাস গড়া নাকি ভবিষ্যতের পথে কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়া? কী বিশেষণে পরিচিতি পাবে শনিবারের কর্মসূচি? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সবুজ পতাকা দেখিয়ে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন করলেন। সফরের সঙ্গী হল উত্তরবঙ্গ সংবাদ।  

দীপ সাহা

তোমরা ভালো কইরা বাজাও গো দোতারা,

সুন্দরী কমলা নাচে!

অসম থেকে বাংলা- সুন্দরী কমলা শুধু নাচল নয়, সেই নাচন দেখতে নাচিয়েও ছাড়ল। মাঠঘাট, জলাজমি, রেললাইন, জাতীয় সড়ক, স্টেশন, ইয়ার্ডে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হল জনতাকে। দোতারা নয়, ফোনে ফোনে বাজল রিল আর ভিডিও’র নোটিফিকেশন টোন।

সকাল থেকেই শীতের বিন্দুমাত্র লেশ নেই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। সূর্যের প্রখর তাপ ছড়িয়ে পড়েছে নীলাচল পাহাড়ের কোণে। সেই রোদ গায়ে মেখেই কামাখ্যা স্টেশনে তুমুল ব্যস্ততা। কমলা সুন্দরীকে একটাবার চোখের দেখা দেখার জন্য উতলা হাজার হাজার মানুষ।

স্টেশনের দু-নম্বর প্ল্যাটফর্মে এক পা আর ক্রাচে ভর করে প্রণাম ঠুকছিলেন মধ্যবয়সি এক তরুণ। সম্ভবত কোনও দুর্ঘটনায় পা কাটা পড়েছে। পরনে মলিন শার্ট। সেখান থেকে খানিক দূরে ফুলমালায় সজ্জিত ‘সুন্দরী কমলা’ তাঁর কাছে যেন অচেনা এক ‘ভারত’। সেই ভারতকেই দূর থেকে চাক্ষুষ করছিলেন তরুণ। চোখে অনেক স্বপ্ন, সে ‘ভারত’-কে ছুঁয়ে দেখার। কিন্তু সাধ্যি বোধহয় তাঁর নেই।

প্ল্যাটফর্ম ধরে এগিয়ে যেতেই প্রথম যে বাক্য দুটো মগজাস্ত্রে সজোরে ধাক্কা মারল, সেটা এরকম- ‘মোদি হ্যয় তো মুমকিন হ্যয়’। ‘অব কি বার- বন্দে ভারত স্লিপার’। বক্তা এক অবাঙালি ভ্লগার। এসেছেন সুদূর দিল্লি থেকে।

ঠিক ধরেছেন। এতক্ষণ যে কমলা সুন্দরীর বর্ণনা দিচ্ছিলাম, সে সুন্দরী আসলে বন্দে ভারত। আরও স্পষ্ট করে বললে ভারতের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন। গাঢ় কমলা রংয়ে বাইরে থেকে তো বটেই, ভেতর থেকেও সে মোহময়ী। তার গড়ন, গায়ের রং যে কাউকে প্রেমে ফেলতে পারে অনায়াসে।

ছাব্বিশে ভোটরঙ্গে মাতবে বাংলা আর অসম। তাই মোদিও দুই রাজ্যকে মাতিয়ে দিলেন বন্দে-বন্দনায়। ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন। শনিবার বারবেলায় মালদা স্টেশনে দাঁড়িয়ে সবুজ পতাকা নাড়িয়ে ছুটিয়ে দিলেন জোড়া বন্দে ভারত স্লিপার।

নির্ধারিত সময় ছিল বেলা ১২:৪৫। কিন্তু ইতিহাস তৈরি হতে লেগে গেল আরও অনেকটা সময়। দুপুর ঠিক ১টা ২৫ মিনিটে ‘আমন্ত্রিত’ যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করল দুটি ট্রেনই।

কামাখ্যা স্টেশন ছেড়ে হাওড়াগামী ট্রেন এগোতেই বাইরে মুহুর্মুহু চিৎকার। উচ্ছ্বাস যেন ধরে না। ব্রহ্মপুত্রকে সাক্ষী রেখে ট্রেনের ভেতরের পৃথিবীটাও বদলাতে শুরু করে দিল একটু একটু করে। মুঠোফোন, মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা হাতে তখন চূড়ান্ত ব্যস্ততা।

দিল্লি, গুরুগ্রাম, পাটনা থেকে এসেছেন একদল ভ্লগার। কখনও গ্লাসভর্তি জল রেখে ভিডিও করে বোঝাতে চাইছেন এ ট্রেনের দুলুনি কত কম, কখনও আবার শৌচালয়ের দরজা খুলে চিলচিৎকার করছেন, ‘গউর সে দেখিয়ে, ইয়ে হ্যায় অন্দর কা মামলা। ব্লা ব্লা ব্লা…’

দলটির সবাইকে বেশ খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, এঁরা যা দেখছেন- যা বলছেন তার সবটাই ভালো। খটকা লাগল। সবার কি সব ভালো হয় আদৌ!

ওই দলেই ছিলেন হর্ষবর্ধন। থাকেন দিল্লিতে। হিল্লি, দিল্লি ঘুরে ট্রেনের ভিডিও-ই বানান। রীতিমতো গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘রেলমন্ত্রকই তো আমাদের নিয়ে এসেছে। আসা-যাওয়া, হোটেলে থাকা-খাওয়ার সব খরচ দেবে। এই ট্রেনে হাওড়ায় গিয়ে নামব। সেখানেও হোটেলের ব্যবস্থা থাকছে।’ বুঝতে বাকি রইল না ‘সব ভালো’র পেছনে রহস্যটা কী।

বি-৭ কামরায় নির্ধারিত আসন ছেড়ে একটু এগিয়ে গেলাম। পেছনেই বি৫ কামরার কাছে গিয়ে বুঝলাম, ১০৮০ পি আর ৪কে-র ঝকঝকে ‘পেড’ রিল বা ভ্লগের পেছনে লুকিয়ে আছে এক রূঢ় বাস্তব। যে বাস্তব সবসময় সামনে আসে না।

ওই কামরাতেই স্বয়ংক্রিয় দরজা পেরিয়ে ঢুকতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেলেন সন্দীপ কালিতা। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে হাসতে হাসতে তাঁর স্বগতোক্তি, ‘জোর সা ধাক্কা মিলা। ইয়ে সেন্সর কাম নেহি কর রহা হ্যয় শায়েদ’। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনকর্মীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনিও দু’বার ধাক্কা খেলেন। খানিক বাদে একই দৃশ্য নজরে এল বি-৭ কামরায়।

সেখানেই কথা হচ্ছিল আরেক ভ্লগার ভাস্কর কর্মকারের সঙ্গে। কলকাতার বাসিন্দা ভাস্করেরও নেশা ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে ভিডিও বানানো। দিল্লির হর্ষবর্ধনের মতো নয়, তিনি নিজ খরচায় নিজ উদ্যোগেই এসেছেন বলে দাবি করলেন। প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা কেমন? গলা খাঁকি দিয়ে নড়েচড়ে বসলেন ভাস্কর, ‘জানেন তো দাদা, সত্যি বলতে এর থেকে এলএইচবি কোচ অনেক ভালো। অনেক আরামদায়ক।’ স্বয়ংক্রিয় দরজার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছেও সুখকর নয়। ভাঙা হুক দেখিয়ে বললেন, ‘নতুন ট্রেনেই এই অবস্থা। তাহলে পরে ভাবুন কী হবে। আসলে ভোট সামনে তো। তাই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সাজাতে পারেনি বোধহয় ঠিক করে।’

নীলাচল পাহাড় ছাড়িয়ে বন্দে ভারত তখন ছুটে চলেছে নিজস্ব গতিতে। পেছনে ফেলে আসছে প্রাণহীন শুকনো ধানখেত। প্রত্যেক যাত্রীর হাতে ততক্ষণে উঠে গিয়েছে লাঞ্চ। কথা ছিল, কামাখ্যা থেকে ট্রেনে মিলবে অসমিয়া খাবার। কিন্তু প্রথম দিনের যাত্রায় পাতে পড়ল ঠান্ডা ম্যাড়মেড়ে ভাত, দু’চামচ মুগের ডাল, আলু-বিনস ভাজা আর পালং পনির। সঙ্গে একখানা মিষ্টি। যার কোনওটাই ‘অসম-স্পেশাল’ নয় বলে জানালেন সহযাত্রী নরেশ সাইকিয়া।

নামি রেস্তোরাঁ থেকে ‘ঠান্ডা’ খাবার পাতে পড়ায় খানিক হতাশ বঙ্গাইগাঁওয়ের সুপর্ণা বড়ুয়া, ‘লাঞ্চ নিয়ে অনেকটা প্রত্যাশা ছিল। এর থেকে শতাব্দীর খাবার ঢের ভালো।’ লাঞ্চে মন না ভরলেও যাঁরা সন্ধ্যার স্ন্যাকস পেয়েছেন, তাঁদের মুখে অবশ্য চওড়া হাসি। সুপর্ণার অবশ্য সে ভাগ্যি হয়নি আগেই ট্রেন থেকে নেমে পড়ায়।

বিকেলের চায়ে চুমুক দিতে দিতে কখন যে ট্রেন ভোগালি বিহুর অসম ছেড়ে এসেছে, খেয়ালই হয়নি। ‘কমলা সুন্দরী’ যখন ওপাড় থেকে বাংলার প্রথম স্টেশন জোড়াই ছুঁল, তখন রোদ এলিয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা বলছে, সময় পাক্কা ৪টে বেজে ২৫ মিনিট।

হলুদ সর্ষেখেত ছেড়ে ঘরে ফেরার সময় চাষির দল ফিরে ফিরে দেখছে কমলা সুন্দরীকে। শামুকতলা রোডে ট্রেন থামবে না জেনেও প্ল্যাটফর্মে মুঠোফোন নিয়ে অপেক্ষায় অনেক হাত।

বাইরের আলো পড়ে আসছে একটু একট করে। কামরার ভেতর দুধসাদা এলইডি আলো নিভে হলুদ আভা নিচ্ছে। বদলে যাওয়া আলোয় আবছা হয়ে আসছে বাইরেটা। পাশ দিয়ে অকস্মাৎ ছুটে চলা আইসিএফ কোচ থেকে তবু কোনও এক ‘অচেনা’ যাত্রী উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকে কমলা সুন্দরীর দিকে। আর আনমনে আমি ভাবি, ওই পাড়টাই তো সত্যিকারের বাস্তব।

আসলে মোদির মেক ইন ইন্ডিয়া যখন বুলেট ট্রেনের স্বপ্নে বুঁদ, ঠিক তখনই প্রাণ হাতে নিয়ে লক্ষ লক্ষ লোক সওয়ার মান্ধাতা আমলের আইসিএফ কোচে। কারণ মোটা টাকা দিয়ে বন্দে ভারত বা ভবিষ্যতের বুলেট ট্রেনের ‘সুরক্ষা’ কেনা তাঁদের কাছে অলীক স্বপ্ন। মেহনত করে ঘাম ঝরানো শ্রমিক, চাষি কিংবা কোনও পরিযায়ী শ্রমিক ঘুমোতে চান না বন্দে ভারতের আরামদায়ক বার্থে। বরং তার চাইতে তাঁর অনেক বেশি দরকার মাথার ওপর একটা ছাদ কিংবা কাজের নিশ্চয়তা।

সে যাগ গে।

লেখাটা পড়তে পড়তে এতক্ষণে ফোনে নিশ্চয়ই ভিডিও’র নোটিফিকেশন পেয়ে গিয়েছেন। কিংবা ফেসবুক ফিড নীল থেকে কমলা হয়ে গিয়েছে আপনার অজান্তেই। আসলে আমরা নাচ দেখতে দেখতে কখন যে নেচে উঠি, তা নিজেরাই বুঝি না।

সুতরাং চলুন সমস্বরে বলি, ‘বন্দে ভারত কি… জয়!’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *