রণধীর চক্রবর্তী
গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান নিজেকে বিশ্বমঞ্চে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে, যা বহির্বিশ্বের অবিরাম চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণভাবে দৃঢ় ও স্থিতিশীল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, তাদের শাসন ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং তা জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে পুষ্ট। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক একঘরে অবস্থা কিংবা আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ— সবকিছুকেই ইরানি নেতৃত্ব বরাবর তাদের আদর্শিক দৃঢ়তার প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে নয়। কিন্তু আজ ইরানের সামনে যে সংকটটি সবচেয়ে গভীর ও বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিয়েছে, তার উৎস ওয়াশিংটন, তেল আভিভ বা রিয়াধ নয়; বরং এই সংকটের বীজ লুকিয়ে আছে ইরানি সমাজেরই গভীরে। বর্তমান ইরান এক বহুমাত্রিক অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং এক অনমনীয় রাষ্ট্রকাঠামো মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এটি আর কোনও বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলন নয়; বরং শাসন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ফাটল। এই অস্থিরতার অভিঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এর কূটনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য অপরিসীম। পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের যে সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক নীতি রয়েছে, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলছে।
প্রজন্মের সংঘাত ও আদর্শিক বিচ্যুতি
অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকেই রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যানের শুরু। ইরানে অর্থনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাস নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—সেগুলি খুব দ্রুতই রাজনৈতিক ভাষা ও মৌলিক দাবিতে রূপ নিচ্ছে। ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সর্বোচ্চ নেতার প্রশ্নাতীত ভূমিকা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই আমূল পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের তরুণ প্রজন্ম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নীচে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের বীরত্বগাথা কিংবা আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি শুধুই ইতিহাসের ধূসর পাতা; এর কোনও প্রত্যক্ষ আবেগীয় আবেদন তাদের প্রাত্যহিক জীবনে নেই। তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে বিশ্বায়ন, ডিজিটাল সংযোগ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার আধুনিক ধারণাকে কেন্দ্র করে। এই ‘জেনারেশন জেড’-এর কাছে রাষ্ট্রের কঠোর নৈতিক পুলিশিং, পোশাকবিধির কড়াকড়ি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে দেশের বিচ্ছিন্ন থাকাটা ক্রমশ অচল ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা কেবল এক বছরের আন্দোলন ছিল না; বরং তা ছিল কয়েক দশকের চাপা ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ। যদিও রাষ্ট্রীয় পেশিবল দিয়ে সেই আন্দোলন স্তিমিত করা হয়েছে, কিন্তু সমাজের ভেতরে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা আজও অমলিন।
অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব ও ক্ষমতার অন্দরমহল
ইরানের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং পদ্ধতিগত অর্থনৈতিক বিপর্যয়। মুদ্রাস্ফীতি আজ সাধারণ মানুষের সহনসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে, যার ফলে খাদ্য, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলি ক্রমেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই এই পরিস্থিতির জন্য আংশিকভাবে দায়ী, কিন্তু ইরানি জনমত আজ শুধু বিদেশিদের দোষ দিয়ে শান্ত থাকতে নারাজ। দেশের ভেতরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, কাঠামোগত দুর্নীতি এবং বিশেষ করে অনির্বাচিত শক্তিকেন্দ্র—ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার অতিকেন্দ্রিকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিতৃষ্ণা তৈরি করেছে। একটা সময় ছিল যখন ‘বাজারি’ বা ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী সমাজকে ধর্মীয় শাসনের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে ধরা হত। আজ সেই ব্যবসায়ীরাও যখন ধর্মঘটের পথে হাঁটেন, তখন বুঝতে হবে সংকটের গভীরতা আদর্শের সীমা ছাড়িয়ে অস্তিত্বের লড়াইয়ে পৌঁছেছে। সাধারণ ইরানিদের কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামাজিক ন্যায় ও মর্যাদার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজ বাস্তব জীবনের কঠোর অভিজ্ঞতায় মলিন। এই অর্থনৈতিক হাহাকারই আজ রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রধান প্রবেশদ্বার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন মানুষ দেখে যে তার ঘাম ঝরানো আয়ের কোনও মূল্য নেই, তখন সে রাষ্ট্রের উচ্চতর আদর্শের চেয়ে নিজের অধিকারের দাবিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
দমনের পরিকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ফাটল
ইরানি রাষ্ট্র ব্যবস্থা বরাবরের মতোই এই বিক্ষোভের মোকাবিলা করেছে চিরাচরিত কঠোর দমননীতির মাধ্যমে। ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, গণগ্রেপ্তার, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি প্রচার এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর সরাসরি বলপ্রয়োগ— এসবই স্পষ্ট করে দেয় যে, সরকার সম্মতির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে, যার অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক। তবে আজকের এই দমনপীড়ন আগের দশকের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক যুগে সহিংসতা কেবল প্রতিবাদ থামায় না, বরং তা ক্ষোভকে আরও গভীর ও সংঘবদ্ধ করে তোলে। নিহত ও বন্দিদের স্মৃতি আজ ব্যক্তিগত শোক ছাড়িয়ে সমষ্টিগত প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল দমনের এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ— যেখানে নিরাপত্তাবাহিনী, বিচার বিভাগ এবং প্রচারযন্ত্র একত্রে এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার লক্ষ্য সামাজিক মধ্যস্থতা নয়, বরং একতরফা কর্তৃত্ব বজায় রাখা। অথচ এই কঠোরতার আবহেও ক্ষমতার ভেতরে ফাটল স্পষ্ট হচ্ছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ক্রমাগত অনির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। সংস্কারপন্থী আমলা ও প্রযুক্তিবিদরা আজ প্রান্তিক, আর সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের প্রভাব ক্রমবর্ধমান। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ইরানকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আগামীর পথ চলা
আন্তর্জাতিক স্তরে তেহরান আজও সব অস্থিরতার পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র বা ‘শত্রুরাষ্ট্রের’ হাত দেখে। শাসকগোষ্ঠীর কাছে এই বয়ান রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হলেও, সাধারণ ইরানিদের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ কমছে। ভারতের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশের জন্য ইরানের এই অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগরক্ষা করতে ভারতের কাছে ইরানের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। যদি ইরান দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কবলে পড়ে, তবে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ইরান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও আক্রমণাত্মক বা অনিশ্চিত আচরণ করতে পারে, যা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং প্রবাসী ভারতীয়দের ওপর প্রভাব ফেলবে। ভারতের জন্য এখন কেবল রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তববাদ যথেষ্ট নয়; ইরানের সমাজ ও নতুন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনকেও আমাদের কৌশলগত হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। কারণ আগামীর ইরান গড়ে উঠবে সেই সংযুক্ত ও সচেতন তরুণ প্রজন্মের হাতে, যারা আজ পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে নামছে। ইরানের অন্তর্দহন এখনও শেষ হয়নি; বরং এটি এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের পথে হাঁটবে নাকি আরও কঠোর হবে— সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে কেবল ইরানের নয়, বরং গোটা পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা।
(লেখক অধ্যাপক)
