রুদ্র সান্যাল
অসহিষ্ণুতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা সচরাচর ধর্মীয় বিভাজনের কথাই আগে মনে করি। সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্ক— সবই যেন ইঙ্গিত করে যে অসহিষ্ণুতার একমাত্র ক্ষেত্র ধর্ম। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অসহিষ্ণুতা আজ সমাজজীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে— পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা থেকে রাজনীতি, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে রাষ্ট্রীয় স্তরের নীতি পর্যন্ত। নতুন বৈষম্য, নতুন বিরোধ, নতুন ক্ষোভ— সবই মিলেমিশে এক বিস্তৃত সামাজিক সমস্যার রূপ নিচ্ছে।
ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব ও আলোচিত সমস্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মের নামে সংঘাত বেড়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গিয়েছে, বিশ্বে প্রায় ৫৭ শতাংশ দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নানামুখী চাপ রয়েছে। ভারতেও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর শিরোনামে এসেছে। কিন্তু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার এই চিত্র সমাজের বৃহত্তর অসহিষ্ণুতার কেবল একটি অংশ। আরও গভীর ও নীরব অসহিষ্ণুতা প্রতিদিন আমাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে ছড়িয়ে পড়ছে— যা অনেকসময় আলোচনায় আসে না, কিন্তু প্রভাব ফেলে আরও বিস্তৃতভাবে।
সমাজে মতের ভিন্নতা গ্রহণ করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের এমন বুদবুদে আটকে রাখে যেখানে আমরা কেবল নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনি। ফলে অন্য মতের প্রতি সহনশীলতা কমে যায়। একই ঘটনা দেখা যায় রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রেও। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মতের প্রতি গ্রহণযোগ্যতা থাকা জরুরি। অথচ আজ রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ভিন্নমতকে অনেকেই শত্রুতার চোখে দেখেন। যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আলোচনার বদলে বিদ্বেষ তৈরি হয়। ফলে সমাজ আরও বিভক্ত হয়ে পড়ে।
শিক্ষাঙ্গনেও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ক্যাম্পাসে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা বা প্রতীকী স্বাধীনতার সংকট— এসবই নির্দেশ করে যে সহিষ্ণুতার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। অথচ শিক্ষাঙ্গনই হওয়া উচিত মতের চর্চা, বিতর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রশিক্ষণের জায়গা। সেখানে যদি অসহিষ্ণুতা দানা বাঁধে, তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা কীভাবে সহনশীলতার চর্চা করবে?
অসহিষ্ণুতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল অর্থনৈতিক জীবন— বিশেষ করে বেকার এবং চাকরিজীবীদের মধ্যেকার টানাপোড়েন। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব ভারতের অন্যতম গুরুতর সমস্যা। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)-র তথ্য অনুযায়ী, দেশে যুবসমাজের বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। এই পরিস্থিতিতে চাকরি পাওয়া মানুষের প্রতি কিছু বেকারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাঁরা মনে করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পাচ্ছেন না, অথচ অন্যরা হয়তো ভাগ্য বা পরিচিতির কারণে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চাকরিজীবীরাও নানা অসুরক্ষা ও সংকটের মধ্যে দিন কাটান— চাকরি হারানোর ভয়, কাজের চাপ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা, অপ্রতুল বেতন বৃদ্ধি সব মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাঁরা চাপে থাকেন। ফলে তাঁরা অনেক সময় বেকারদের ক্ষোভকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেন, কিংবা নিজেদের অবস্থান রক্ষার চেষ্টায় আরও কঠোর হন।
এই দুই শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক ঈর্ষা ও অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সমাজে অদৃশ্য এক অসহিষ্ণুতার জন্ম দিচ্ছে। পরিবার বা বন্ধুদের মধ্যেও দেখা যায়— একজন চাকরি পেলেই অন্যজনের মধ্যে হীনম্মন্যতা, বিরক্তি বা ঈর্ষা জন্ম নেয়। আবার চাকরিজীবীরা কখনো-কখনো বেকার বন্ধুদের ‘অক্ষম’ বা ‘অপরিশ্রমী’ ভাবতে শুরু করেন— যা সম্পূর্ণ অবিচার। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি সমাজে আর্থিক-মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়ায়। অথচ, দুই পক্ষের বাস্তব সমস্যাই সত্য— একদিকে কর্মসংস্থানের সংকট, অন্যদিকে কর্মস্থলের চাপ। সমাধানও তাই একপাক্ষিক নয়; দরকার নীতিগত পরিবর্তন, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ, এবং সবচেয়ে বড় কথা— পারস্পরিক সহানুভূতি।
এই বৃহত্তর অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে আজ সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হল এসআইআর-(স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)-এর কাজের সঙ্গে যুক্ত বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার)-দের প্রতি সমাজের মনোভাব। মাঠ পর্যায়ে প্রতিদিন অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজ করতে হচ্ছে এই কর্মীদের— অপর্যাপ্ত সময়, জনবল সংকট, প্রযুক্তিগত সমস্যা, অবিরাম আপডেট, আর প্রশাসনিক চাপ। অথচ সামাজিক মাধ্যমে বহু মানুষ ঠাট্টা করে লিখছেন, ‘এতদিন ফাঁকি মেরে শরীরে জং ধরে গিয়েছে, তাই কাজ করতে পারছে না।’ কেউ ভাবছেন না যে, নথি যাচাই থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি ঘোরা— এই প্রতিটি দায়িত্বই কী কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁদের পালন করতে হচ্ছে। বরং তাঁদের প্রতি অবজ্ঞা, কটাক্ষ এবং অপমানসূচক মন্তব্যই বেশি চোখে পড়ছে। এতে স্পষ্ট যে, সমাজে সহানুভূতির জায়গা ক্রমশ ছোট হচ্ছে, এবং অসহিষ্ণুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে অন্যের পরিশ্রম, সমস্যা বা সংগ্রাম— কিছুই বোঝার প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে না।
পরিবারেও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। প্রজন্মগত ব্যবধান, আর্থিক চাপ এবং সময়ের অভাব— সব মিলিয়ে পরিবারে কথা বলার জায়গা কমে যাচ্ছে। ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্তি, উত্তেজনা ও তর্ক তৈরি হচ্ছে। আগের যুগে পরিবার ছিল মানসিক নিরাপত্তার জায়গা; আজ অনেকের জন্য সেটিও চাপের জায়গা হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও এই অসহিষ্ণুতার জন্ম দিচ্ছে। আমরা দ্রুতগতির জীবনে ধৈর্য হারাচ্ছি, দ্রুত বিচার করতে চাই, দ্রুত রাগ করি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই। ফলে সমাজে সহনশীলতার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক বিভাজন, প্রযুক্তিগত চাপ— সবই মিলেমিশে নতুন ধরনের অসহিষ্ণুতার জন্ম দিচ্ছে। আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না কতখানি রেগে যাচ্ছি, কতখানি বিরক্ত হচ্ছি, বা কতখানি অন্যের ওপর ঈর্ষা তৈরি করছি। অথচ সহিষ্ণুতা গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে— ক্ষমা করার চর্চা, বোঝার চেষ্টা, সময় দেওয়া, অন্যের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া— এসবের মধ্য দিয়ে।
সমাজে অসহিষ্ণুতা কমানোর সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে কথোপকথন। মতের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিন্নতাকে সম্মান করার চর্চা আমাদের শিখতে হবে। শিক্ষা, পরিবার, প্রশাসন, মিডিয়া— সব জায়গায় সহিষ্ণুতা বাড়ানোর উদ্যোগ জরুরি। ব্যক্তিগত সম্পর্কেও আমাদের গভীর মনোযোগ দরকার— অভিযোগ নয়, বোঝার চেষ্টা; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা; ঈর্ষা নয়, আন্তরিকতা।
আজ অসহিষ্ণুতা শুধু ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই— এটি সমাজের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা যদি রোধ না করা যায়, তাহলে সামাজিক শান্তি, গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং মানুষের মানসিক সুস্থতা— সবই হুমকির মুখে পড়বে। সহিষ্ণুতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং সভ্যতার শক্তি। আমাদের সম্মিলিত চর্চার মাধ্যমেই সহিষ্ণুতাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে— নিজের ভিতরে, সমাজের ভিতরে, ভবিষ্যতের ভিতরে।
(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)
