গোপন কথাটি…

গোপন কথাটি…

শিক্ষা
Spread the love


বিখ্যাত কবি বহুকাল আগে বলে গিয়েছেন, নামে কী আসে যায়। কিন্তু আজকাল বারবার প্রমাণ হচ্ছে, নামে অবশ্যই অনেক কিছু যায় আসে। বিশেষ করে যদি সেই নাম কোনও মতাদর্শগত পরিচয়কে তুলে ধরার প্রয়োজনে হয়। এমনটাই হয়েছে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকার ২০০৫ সালে গ্রামাঞ্চলের গরিব মানুষের কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করেছিল মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট।

লোকমুখে গত ২০ বছর ধরে সেই প্রকল্প মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজ নামে বহুল প্রচলিত। এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নাম বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রস্তাবিত নতুন নামটি হল- বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)। সংক্ষেপে ভিবি জি রাম জি। আরও একটু মাজাঘষা করলে জি রাম জি হয়ে উঠবে নতুন বিলের নাম।

মহাত্মা গান্ধির বদলে রামের ছোঁয়ায় সরকারি প্রকল্পের এই নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি, প্রিয়াংকা গান্ধি ভদরা, তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়, সপা সভাপতি অখিলেশ যাদব সহ একাধিক বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, মনরেগা থেকে তাঁর নাম বাদ দিয়ে গান্ধিজি ও তাঁর আদর্শকে অপমান করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

রাহুলের অভিযোগ, মনরেগা গোড়া থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চক্ষুশূল। তিনি দুটি জিনিসকে ঘৃণা করেন। একটি মহাত্মা গান্ধির আদর্শ, অপরটি গরিবদের অধিকার। মনরেগায় রাজ্যের কোটি কোটি টাকা বকেয়া মেটানোর পরিবর্তে গান্ধিজির নাম বদলানোর চেষ্টাকে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে তৃণমূল। মনরেগাকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে জোড়াফুল শিবির।

তবে যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে নতুন বিলটি সংসদে পেশ করে কেন্দ্রীয় কৃষি ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান দাবি করেছেন, গান্ধিজির রামরাজ্য স্থাপনের ভাবনাই বলা আছে জি রাম জি বিলে। প্রকল্পে ১০০-র বদলে বছরে ১২৫ দিন গরিবরা কাজ পাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু গান্ধিজির নাম সরিয়ে রামের নামে বিলটিকে বৈতরণি পার করতে গিয়ে মোদি সরকার আসলে রাজ্যগুলির ওপর বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক দায় চাপিয়ে দিচ্ছে।

এতদিন মনরেগায় মজুরির পুরো দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রের। নতুন বিলে সেটা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ৬০ ও ৪০ শতাংশে ভাগাভাগি করে দেওয়ার প্রস্তাব আছে। এই পদক্ষেপে কেন্দ্রের কিছু সাশ্রয় হবে ঠিকই। কিন্তু রাজ্যগুলির কাঁধে যে ৪০ শতাংশ আর্থিক দায় চাপানো হচ্ছে, সামাল দেওয়ার দিশা দেখাতে পারেননি শিবরাজ। দেশপ্রেমের মোড়ক নয়তো হিন্দুত্বের প্রলেপ দিয়ে মানুষের নজর ঘোরাতে গেরুয়া শিবিরের পুরোনো কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে এতে।

কিছুদিন আগে সংসদে বন্দে মাতরমের সার্ধশতবর্ষ নিয়ে বিতর্কে সাধারণ মানুষের কী লাভ হল, সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যা মেলেনি। মনরেগায় মহাত্মা গান্ধির বদলে জি রাম জি এনে নামকরণে একদিকে হিন্দুত্বের বীজ বপন করা হয়েছে, অন্যদিকে গান্ধিজিকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে। ভারতীয় জনমানসে স্থান পেতে গান্ধিজি, সর্দার প্যাটেল, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আঁকড়ে ধরলেও জওহরলাল নেহরুকে নতুন প্রজন্মের সামনে খলনায়কে পরিণত করতে প্যাটেল-নেতাজির সঙ্গে তাঁর বিরোধ খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে।

বাস্তবে কিন্তু দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে ওই তিনজনের অবস্থানগত মিলগুলিকে ব্রাত্য করে রেখে দেওয়া হচ্ছে। আশঙ্কা হয়, রামনামের শরণ নিয়ে গান্ধিজিকে মুছে ফেলার ঔদ্ধত্য দেখানোর পর আগামীদিনে প্রয়োজন ফুরোলে প্যাটেল, নেতাজিকেও কি মুছে ফেলা হবে? আরএসএসের হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তানের আদর্শকে বাস্তবের রূপ দিতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির সরকার।

The put up গোপন কথাটি… appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *