সম্মোহনী সুরের অলংকার সতীনাথ

সম্মোহনী সুরের অলংকার সতীনাথ

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অলক রায়চৌধুরী

মোহিতলাল মজুমদারের কবিতার সঙ্গে মিলে গেল ভাস্কর বসুর গানের কথা। সে গান গাইবেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। গানের প্রথম কলি ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলংকার’। সুর করেছেন সুধীন দাশগুপ্ত। ভাস্কর চাইছেন, অলংকারকে অহংকার করতে। নারাজ সতীনাথ। অভ্যাস করে ফেলেছেন যে! রেকর্ড হয়ে সে গান বাজারে বেরোনো মাত্র জনপ্রিয়তা এবং কোর্টের কেস দুটোই এল সমারোহে। মোহিতলালের প্রকাশক মামলা ঠুকেছেন।

সে মামলার পরিণতি কী হয়েছিল জানা নেই, কিন্তু সেই সোনার কণ্ঠের শতাধিক মরমি গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে অক্ষয় অব্যয়। খোদ লতা মঙ্গেশকর ওঁর গলায় ভজন শুনে চেয়ে নিয়েছিলেন শারদ অর্ঘ্যর পুজোর গান। আকাশপ্রদীপ জ্বলে এবং কত নিশি গেছে নিদহারা সেই অমল দুটি গান। বাংলা গানে লতার সেই প্রথম প্রবেশ।

আজই যাঁর শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে, সেই সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কোনও কপি হয়নি বাংলা। তাঁর প্রধান ছাত্র জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় বলতেন, উত্তর ভারতীয় প্রায় সব সংগীতধারা কণ্ঠস্থ ছিল সতীনাথবাবুর। বিস্ময়কর প্রতিভা, কিন্তু সম্মান পেলেও সেই অর্থে বাজারধন্য হয়নি তাঁর গান। অর্থ পাননি। অর্থের কষ্ট ছিল বরাবর।

বড়ে গোলাম আলি খাঁ-র স্নেহধন্য সতীনাথবাবুর গান স্মৃতিতে হাতড়াতে হয় না। একটির পেছনে আর একটি চলে আসে। বনপথ মাঝে, জীবনে যদি দীপ, কত না হাজার ফুল, এলো বরষা, আমার এই গানে, পাষাণের বুকে লিখো না, উৎপলা সেনের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে মাঝে নদী বহে রে, রাতের আকাশ, যেদিন জীবনে তুমি– এ তালিকা কি শেষ হয়?

দুঃখের গানের পূজারী নাম দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই হেমন্তবাবুর জন্য ‘তোমার আমার কারো মুখে কথা নেই’ তৈরি করে আনলেন সতীনাথ। হেমন্তর গান-জীবনের এ এক মাইলফলক সন্দেহ নেই। শিল্পীদের সঙ্গে সহমর্মিতায় অদ্বিতীয় সতীনাথ। সমসাময়িক বিখ্যাতদের দিয়ে গাইয়েছেন।

সতীনাথের গলায় বাংলা রাগপ্রধান অন্যরকম প্রাণ পেয়েছে বাররার। তিনি নিজে যেমন শুদ্ধসুরে নজরুলগীতি গাইতেন, তেমন মহম্মদ রফিকেও ট্রেনিং দিয়েছিলেন নজরুলগীতি গাইতে। রফির গলায় জনপ্রিয় আধুনিক বাংলা গান রয়েছে সতীনাথের সুরে।

সারা ভারতে শীর্ষ গজল গাইয়েও ছিলেন তাঁর সময়ে। তবে আশ্চর্য কোনও এক বা একাধিক কারণে সেই অর্থে প্লে ব্যাকে ডাক পাননি। তবে বাঙালি ভুলবে না তাঁর কিছু ছবির গান– মাঝে নদী বহে রে, ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরছেই। দুটোই স্ত্রী উৎপলার সঙ্গে। আর একটা গান হিট ছিল– সাগরে মিশিলে নদীর মরণ নাহি হয়।

সে নিয়ে অবশ্য কোনও খেদ ছিল না সতীনাথের। দীপক মৈত্রদের মতো ছাত্র গড়েছেন, যাঁর গলার কিংবদন্তি গায়ন ‘এ তো নয় শুধু গান’- এ সুরকার হিসেবে সমুজ্জ্বল সতীনাথ। আকাশবাণীর অডিশনে বারবার অনুত্তীর্ণ সতীনাথকে সম্মানের আসন দিয়েছিলেন তৎকালীন আকাশবাণীর কেন্দ্র অধিকর্তা। আর শ্রোতারা দিয়েছেন প্রশস্ত হৃদয়ের প্রশ্রয়। স্ত্রী উৎপলাকে নিয়ে দশকের পর দশক সে সব হৃদয়ে সুর বপন করেছেন শিল্পী যার অনুরণন চিরস্থায়ী। শতবর্ষে সেই মরমি গায়ককে বাংলা গান ভুলবে না।

(লেখক গায়ক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *