- জয়ন্ত ঘোষাল
অতীতে কাশ্মীরে যখনই যেতাম, শ্রীনগর এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সিতে বসতেই চালক জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আর ইউ ইন্ডিয়ান’? ‘আর আমি পালটা প্রশ্ন করতাম, ‘আর ইউ নট?’ সে তরুণ প্রত্যুত্তরে জবাব দিতেন, ‘আই অ্যাম কাশ্মীরি। আই অ্যাম নট ইন্ডিয়ান’।
আমরা এই মন্তব্যে রাগ করতাম। মনে হত, এঁরা এই কাশ্মীরিরা এতকিছু পেয়েও কেন এমন ভারতবিরোধী! আজ মনে হয়, কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতার শিকড় সন্ধান করাও জরুরি। শুধু টাকার জন্য কিছু কাশ্মীরি সন্ত্রাসবাদী হয়ে উঠছে?
পহলগামের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর আবার প্রশ্ন উঠেছে কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী? এই ঘটনার পর তবে কি আবার কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের রক্তবীজের দাপট? ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির পর নরেন্দ্র মোদির সরকার জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কাশ্মীরে নির্বাচন পর্যন্ত করানো হল। শেখ আবদুল্লার নাতি ওমর আবদুল্লাই আজ কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী। বেশকিছু দিন শান্তি বিরাজমান ছিল। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা হলেও এমন একটা ধারণা তৈরি হচ্ছিল, বোধহয় জঙ্গিরা এবার ‘য পলায়তি স জীবতি’ মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে পালিয়েছে।
পহলগামের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেওয়ার নীতিতে কি কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হবে? নাকি তৈলাক্ত একটি বাঁশে বাঁদরের ওঠানামার মতো ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কখনও সংঘাত, কখনও শান্তির প্রয়াস। কিন্তু আদতে কাশ্মীর আছে কাশ্মীরেই?
গোটা পৃথিবীজুড়ে যত ধরনের কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন হয়, তার দুটি দিক থাকে। একটা হল, সংঘাতের মাধ্যমে, যুদ্ধের মাধ্যমে, প্রত্যাঘাতের মাধ্যমে সবক শেখানো, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা। আরেকটা হল, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলে বিচ্ছিন্নতা কমানোর চেষ্টা। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, এই দুটি প্রক্রিয়াই ব্যবহার করে একটা মধ্যবর্তী রাস্তা বের করা প্রয়োজন। আসলে ৩৭০ ধারা মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, বিজেপির সাবেক দলীয় কর্মসূচি রূপায়ণ। এর পাশে পাকিস্তানের সঙ্গে বোঝাপড়া বা আলোচনা করার প্রক্রিয়াটিও জরুরি।
পাকিস্তান নামক পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ঠিক সাত মাস পরে পাকিস্তানের স্রষ্টা মহম্মদ আলি জিন্না আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পল অ্যালিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন আরব সাগরের তীরে। করাচি থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে একটা সমুদ্রতটে। খুব সুন্দর ছোট্ট একটা কুটির। আর সেখানে সমুদ্রতটে বালির ওপর হাঁটতে হাঁটতে জিন্না সে সময় অ্যালিংকে বলেছিলেন, আমার হৃদয়ের সব থেকে পছন্দের বিষয় কী জানেন? আমেরিকার রাষ্ট্রদূত কী জানতে চাইলে জিন্না বলেন, ‘ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ককে মধুর রাখা।’
সত্যি সত্যি জিন্না সাহেব আশা করেছিলেন, ভারত আর পাকিস্তান একসঙ্গে থাকবে। তিনি বলেছিলেন, ‘কানাডার সঙ্গে আমেরিকা যেমন আলাদা থাকলেও একসঙ্গে আছে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে, ভারত আর পাকিস্তান কেন সেই পথে হাঁটতে পারবে না?’ জিন্না চাইলেও বাস্তবে তা হয়নি।
অনেকে বলেন, জিন্না নাকি জেনেবুঝে অসত্য বলেছিলেন। জিন্না আসলে চাননি অথচ বলেছিলেন। এ ছিল কথার কথা। অনেকে আবার বলেন, না, সত্যি সত্যি জিন্না আর যুদ্ধ ও বৈরিতা চাননি।
১৯৪৮ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে জানুয়ারি মাসে নেহরুও বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ভারত আর পাকিস্তান পৃথক দেশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একপক্ষ অন্যপক্ষকে আর কখনও চ্যালেঞ্জ করবে না। এইটুকু আশ্বাস দিচ্ছি যে, পাকিস্তান পাকিস্তানের মতো আলাদা থাকুক। এই পাকিস্তানের সমস্যার বোঝা ভারত আর বহন করতে চায় না। পাকিস্তানের সমস্যা পাকিস্তান সমাধান করুক। ভারত ভারতের সমস্যার সমাধান করুক। কিন্তু পারস্পরিক সদ্ভাব, বন্ধুত্ব বজায় রেখে এগোতে হবে।’ নেহরুর সেই স্বপ্নও কিন্তু সফল হয়নি।
আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আমরা কী দেখছি? দেখছি পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবেও বিপন্ন। অর্থনীতিও বিপর্যস্ত। পাকিস্তানের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া তো অবসরগ্রহণের আগে ভারতের সঙ্গে আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যা নিরসনের কথা বলেন। কার্গিল যুদ্ধের পরেও আগ্রা শীর্ষ বৈঠক করতে পারভেজ মুশারফ এসেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, কাশ্মীর ‘কোর’ ইস্যু। এই ইস্যু নিয়ে আলোচনা হোক। এতদসত্ত্বেও ভারত পাকিস্তানকে বিশ্বাস করেনি। মোদি সরকার বারবার বলেছে, সন্ত্রাস বন্ধ হলেই আলোচনা শুরু হতে পারে।
পহলগামের ঘটনার পর আপাতত আলাপ-আলোচনার পথ রুদ্ধ। আবার ভারত কূটনৈতিক প্রত্যাঘাতের পথে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি পাটনায় গিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, ভারত এর সমুচিত জবাব দেবে। কী সেই সমুচিত জবাব? তা নিয়ে গোটা দেশ উত্তাল। তবে কি আরেকটা যুদ্ধ হবে? কাশ্মীর সমস্যার সমাধান যুদ্ধ দিয়ে হতে পারে বলে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার কিন্তু তা মনে হয় না।
নির্বাচনি রাজনীতিতে মোদি এক জবরদস্ত প্রশাসক, এই ধারণা গোটা দেশজুড়ে তৈরি করতে পারেন। ১৯৭১ সালে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। বাংলাদেশ যুদ্ধের পর ইন্দিরা গান্ধি দেবী দুর্গার সম্মান পেয়েছিলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী স্বয়ং সংসদে তাঁকে মা দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেন। সেই যুদ্ধের পরেও কিন্তু ভারতের অর্থনীতি সংকটে পড়েছিল। অনেক অর্থনীতিবিদ আজও বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের জন্যই ভারতের অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও বাড়ে। আর সেই কারণেই ১৯৭৫ সালে ইন্দিরাকে জরুরি অবস্থার পথে যেতে হয় নিজেকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য। যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর এক ভয়াবহ রাজনৈতিক পরিণতি আমরা দেখতে পেয়েছি।
ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। যুদ্ধ হলে শেয়ার মার্কেটে তার প্রতিক্রিয়া হবে। তা দিয়ে আর যাই হোক, দেশের মানুষের উন্নয়নের বিচার হতে পারে না। পাকিস্তানকে সমুচিত জবাব দিতে হবে। এই মুহূর্তে মোদির এটা আবেগের দাবি। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কার্গিল ধরলে চার-চারটে যুদ্ধ হয়েছে। তারপরেও কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।
তাই সংঘাতের পাশাপাশি কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন।
(লেখক সাংবাদিক)
