সন্তানহীনতার ঝোঁক : মুক্তির ভাষা না কি নিঃশব্দ সংকট?

সন্তানহীনতার ঝোঁক : মুক্তির ভাষা না কি নিঃশব্দ সংকট?

শিক্ষা
Spread the love


অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

লেখাটা শুরু করা যাক ঋত্বিকার প্রাত্যহিক জীবন দিয়ে। প্রতিদিন ভোর ৫টায় তাঁর দিন শুরু হয়, রানাঘাট থেকে লোকালে চেপে কলকাতায় কাজে আসা। গড়ে দুই ঘণ্টার ক্লান্তিকর ট্রেন জার্নি, তার ওপর অফিসের বিপুল কাজের চাপ। কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে। বাড়ি ফিরেই শুরু হয় আরেক লড়াই—পাঁচ বছরের মেয়ের পড়াশোনা সামলানো, রান্নাবান্না আর ঘরকন্নার কাজ। দিন শেষে যখন তিনি ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়েন, তখন নিজের জন্য সময় বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ঋত্বিকা আর তাঁর স্বামী দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভেবেছেন বহুবার, কিন্তু প্রতিবারই মধ্যবিত্ত জীবনের কঠিন হিসাবের খাতা তাঁদের আটকে দিয়েছে। স্কুলের চড়া ফি, ডে-কেয়ারের খরচ, অতিরিক্ত টিউশন, চিকিৎসা ব্যয় আর সবকিছুর ওপর ‘সময়’—যে জিনিসের সব থেকে বড় আকাল তাঁদের জীবনে। ঋত্বিকার এই দীর্ঘশ্বাস আজ আর তাঁর একার নয়। শহর থেকে শহর, দেশ থেকে দেশে এক মধ্যবিত্ত প্রজন্ম ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সন্তান না নেওয়ার। তারা সন্তানকে ভালোবাসে না—এমন নয়; বরং তারা জানে, বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে সন্তান মানে কেবল জন্ম দেওয়া নয়, এটি এক আজীবনের কঠিন দায়িত্ব।

কেরিয়ার ও অসম লিঙ্গবৈষম্যের লড়াই

আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কর্মজীবন আর অভিভাবকত্ব বা ‘পেরন্টিং’ একসঙ্গে চালানো প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক ও পেশাগত চাপ অনেক বেশি তীব্র। সন্তানের জন্মের পর একজন মহিলার কেরিয়ার অনেক ক্ষেত্রে থমকে যায়, পদোন্নতি আটকে যায় কিংবা আয় কমে যায়—এটাই আজকের কঠোর কর্পোরেট বাস্তবতা। অন্যদিকে ঘরের কাজে বা সন্তান পালনে পুরুষদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও, আমাদের সামাজিক পরিকাঠামো আজও পুরোপুরি বদলায়নি। মাতৃত্বের জন্য যে ত্যাগ একজন নারীকে স্বীকার করতে হয়, তার তুলনায় রাষ্ট্রের বা কর্মক্ষেত্রের সহযোগিতা নগণ্য। ফলে অনেক আধুনিক দম্পতি প্রশ্ন তুলছেন—এই অসম লড়াইয়ে কেন নামবেন? কেন নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা কেরিয়ার বিসর্জন দেবেন? এই ব্যক্তিগত চাওয়াপাওয়ার দোলাচলই তাঁদের সন্তানহীন জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে একটি বড় কারণ হল আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচ। বাসস্থানের অনিশ্চয়তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবই আজ সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ। কেউ কেউ মনে করছেন, যে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে রয়েছে কিংবা যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ ক্রমাগত ধ্বংসের পথে, সেখানে নতুন একটি প্রাণকে আনা কতটা নৈতিক? আবার অনেকেই নিজের স্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন আর অর্থনৈতিক স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এই প্রজন্ম সন্তানহীন জীবন বেছে নিচ্ছে কোনও সস্তা বিদ্রোহ থেকে নয়, বরং গভীর সচেতনতা থেকে। তাদের দাবি—একজন ভালো বাবা বা মা হতে হলে আগে নিজেকে ভালোভাবে বাঁচতে জানতে হয়। আর সেই বাঁচার ন্যূনতম শর্তগুলো যদি রাষ্ট্র বা সমাজ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তটিই তাঁদের কাছে অনেক বেশি দায়িত্বশীল বলে মনে হয়।

ইঁদুর দৌড়ে সময়ের আকাল

আধুনিক মানুষের জীবনে সময় আজ সবচেয়ে দামি এবং দুর্লভ সম্পদ। অফিস এখন আর কেবল আট ঘণ্টার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; মোবাইলের স্ক্রিন, ই–মেল বা হোয়াটসঅ্যাপের দৌলতে অফিস এখন ড্রয়িংরুম এমনকি বেডরুমেও ঢুকে পড়েছে। এই অবিরাম ইঁদুর দৌড়ের যুগে সন্তান নেওয়া মানে কেবল আর্থিক দায়ভার নয়, বরং তাকে সময় দেওয়ার এক মানসিক দায়। মানুষ বুঝতে পারছে, সন্তানের জন্য ‘সময় না থাকা’ মানে কেবল ব্যস্ততা নয়, বরং এক ধরনের ব্যর্থতা। আগের প্রজন্ম ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি ভাবার অবকাশ পেত না, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম অতিরিক্ত বিশ্লেষণধর্মী। জলবায়ু সংকট, সম্ভাব্য মহামারি আর চাকরির অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এক নিরাপত্তাহীন জমিতে দাঁড়িয়ে। এই অনিশ্চয়তার জমিতে একটি শিশুকে বড় করা দায়িত্বহীনতা কি না, সেই প্রশ্নটি আজ ডাইনিং টেবিলের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেরন্টিং যখন সামাজিক প্রকল্প

আজকের দিনে সন্তান লালনপালন করার ধারণাটি আমূল বদলে গিয়েছে। সন্তান মানে আজ কেবল একটি নতুন প্রাণ নয়, বরং তাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পৌঁছে দেওয়ার এক অন্তহীন ও জটিল প্রোজেক্ট। ভালো স্কুল, দামি কোচিং, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি এবং মানসিক বিকাশের সম্পূর্ণ ভার এখন কেবল বাবা-মায়ের কাঁধে। আগেকার যৌথ পরিবার বা পাড়াপ্রতিবেশীর যে সামাজিক নিরাপত্তা ছিল, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। সমাজ বা রাষ্ট্র এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জায়গা থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছে। ফলে সন্তান নেওয়া মানে আজ এক ধরনের ‘পারফেকশন প্রোজেক্ট’, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার ভয় প্রবল। এই কঠোর পরীক্ষায় না নামাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছেন অনেক আধুনিকমনস্ক মানুষ। তাঁদের কাছে এটি নিছক স্বাধীনতা নয়, বরং একপ্রকার আত্মরক্ষা।

সামাজিক মুক্তি নাকি নিঃসঙ্গতার পদধ্বনি?

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—এই সন্তানহীনতার ঝোঁক কি আমাদের চূড়ান্ত সামাজিক মুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি এক গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে? নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান না নেওয়া অনেক সময় আত্মনিয়ন্ত্রণের ভাষা হয়ে ওঠে, যা তাঁদের মাতৃত্বের চিরাচরিত বোঝা থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু একইসঙ্গে আরেকটি রূঢ় সত্য আমাদের তাড়া করে ফেরে। আজ যাঁরা সচেতনভাবে একা থাকছেন বা সন্তানহীন থাকছেন, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামোটি কী হবে? আমাদের সমাজ কি সেই একাকিত্ব সামলানোর মতো পরিকাঠামো তৈরি করতে পেরেছে? নাকি আমরা এমন এক যান্ত্রিক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রচুর কিন্তু পারস্পরিক সহমর্মিতা বা ভরসার হাত একদমই নেই? আদিম প্রবৃত্তি হয়তো পরাজিত হয়নি, কিন্তু আধুনিক যুক্তিবোধের ফিল্টারে আজ ‘সারভাইভাল অফ দ্য স্পিসিস’ প্রশ্নবিদ্ধ। এই সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তির চিন্তায় নেই, আছে আমাদের কাজের সংস্কৃতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার আমূল পরিবর্তনের মধ্যে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *