সংঘের মগজাস্ত্রেই বাংলায় পদ্ম-ঝড়

সংঘের মগজাস্ত্রেই বাংলায় পদ্ম-ঝড়

ব্লগ/BLOG
Spread the love


২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্যে শুধুই প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া ছিল না, সঙ্গে ছিল আরএসএস-এর এক দশকেরও বেশি সময়ের নিঃশব্দ, সুপরিকল্পিত এবং তথ্যনির্ভর এক নিপুণ ব্লু-প্রিন্ট।

কৌশিক কর্মকার

বাংলার রাজনীতিতে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে— মাটি না খুঁড়লে ফসল ফলে না। ২০২৬-এর বিধানসভায় বিজেপির ২০৭ আসন জয়ের যে অভাবনীয় দৃশ্য গোটা দেশ দেখল, তা কেবল ওপরতলার কোনও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় হয়নি। টানা পনেরো বছর দাপটের সঙ্গে শাসন করা তৃণমূল কংগ্রেসকে এমনভাবে ধরাশায়ী করার নেপথ্যে ছিল এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ এবং সুপরিকল্পিত লড়াই। এই লড়াইয়ের কারিগর কোনও রাজনৈতিক নেতা নন, বরং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং তাদের নিখুঁত রণনীতি। এটা শুধু একটা নির্বাচনি জয় নয়, বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চূড়ান্ত সাফল্য।

ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দু পরিচিতির রাজনীতি বাংলায় সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘের ৯টি আসন, বা ১৯৯৮-’৯৯ সালে দমদম থেকে বিজেপির তপন সিকদারের পরপর দুটি জয়— সবই ছিল ক্ষণিকের চমক, যা কোনও দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলতে ব্যর্থ হয়। ২০১৪-র উপনির্বাচনে খাতা খোলার পর থেকে শুরু হয় নতুন লড়াই। ২০১৬-তে তিনটি, একুশে ৭৭টি এবং ছাব্বিশে ২০৭টি আসন— এই ধারাবাহিক উত্থান কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। একুশের নির্বাচনে তৃণমূলকে হারানো সম্ভব বুঝে সংঘ তাদের রণনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল স্বয়ং তৃণমূল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সংঘের অন্দরমহলের পর্যবেক্ষকরা অকপটে স্বীকার করেন, বাংলায় বিজেপির এই বিশাল উত্থানের সবচেয়ে বড় ইন্ধন জুগিয়েছে খোদ শাসকদল। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণের তাস খেলা কার্যত অসম্ভব ছিল, ২০১১-র পর সেই অচলায়তন ভাঙতে শুরু করে। আরএসএস নেতাদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার সংখ্যালঘু তোষণ এবং একপেশে নীতির কারণেই রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের জমি তৈরি হয়েছিল, যা হিন্দু সমাজের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। আগে বাংলায় যেমন বাঙালি প্রচারকের ঘোরতর আকাল ছিল, ঠিক যেমন একসময় পঞ্জাবে শিখ প্রচারক পাওয়া যেত না, আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উলটো। তৃণমূলের নীতির বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত অসন্তোষকে পুঁজি করেই তৈরি হয়েছে এক বিশাল বাংলাভাষী প্রচারক বাহিনী। শাসকদলের তোষণ নীতিই যে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক কবর খুঁড়তে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

তবে এই জমি তৈরির কাজটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। চব্বিশের লোকসভায় আশানুরূপ ফল না হওয়ার পর আরএসএস তাদের কৌশল আরও শানিত করে। এর আগে কৈলাস বিজয়বর্গীয় বা অরবিন্দ মেননের মতো নেতারা বাংলার দায়িত্বে থাকলেও, আসল গেমচেঞ্জার হয়ে দাঁড়ান ২০২২ সালে পর্যবেক্ষক হিসেবে আসা সুনীল বনসল। অন্যদিকে, বাংলায় সংঘের পুরো অপারেশনের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন সহ সরকার্যবাহ রামদত্ত চক্রধর এবং ঘোষ প্রমুখ রামচন্দ্র পান্ডে। গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে তাঁরা উত্তর, মধ্য এবং দক্ষিণ— এই তিনটি জোনে ভাগ করে মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট শুরু করেন। বনসল আবেগী ভাষণের পথে না হেঁটে জোর দেন বুথ স্তরের নিখুঁত তথ্যে।

এই রণনীতির অন্যতম ব্রহ্মাস্ত্র ছিলেন ভিনরাজ্য থেকে আসা প্রায় ২,০০০ পূর্ণ সময়ের কর্মী। তাঁরা কোনও মঞ্চে ভাষণ দিতে আসেননি, তাঁদের কাজ ছিল তিন মাসের শিফটে একেবারে তৃণমূল স্তরে নিঃশব্দে কাজ করা। ১৫০ জনেরও বেশি ভিনরাজ্যের বিধায়ক এবং প্রবীণ নেতা প্রায় দু’বছর বাংলায় কর্মী শিবির করে ডেটা অ্যানালিটিক্সের জাল বোনেন। প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রের প্রভারীকে ২০-২৫ পাতার ফোল্ডার দেওয়া হত। সেখানে শুধু ভোটের হিসেবই নয়, ছিল স্থানীয় সমস্যা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুঁটিনাটি, এমনকি তৃণমূলের কোনও নেতা ক্ষুব্ধ এবং তাঁকে কীভাবে দলে টানা যেতে পারে— তার নিখুঁত বিবরণ। ডেটা এবং তথ্যের এত মোক্ষম ব্যবহার বিরোধী রাজনীতিতে কার্যত নজিরবিহীন।

কর্মীদের একটিমাত্র লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল— ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে কাজ করা। ১৫-২০ জনকে নিয়ে ঘরোয়া ‘বৈঠক’-এ সুকৌশলে তুলে ধরা হয় বাঙালি অস্মিতা, কর্মসংস্থান এবং নারী নিরাপত্তার অভাবের কথা। বিশেষ করে আরজি কর কাণ্ডকে সামনে রেখে মহিলাদের মধ্যে শাসকদলের বিরুদ্ধে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তাকে অত্যন্ত সুচারুভাবে সংঘবদ্ধ করেন তাঁরা।

ময়দানের লড়াইয়ে পদে পদে ছিল বাধা। দাপুটে নেতাদের হুমকিতে কর্মীরা এতটাই ভীত ছিলেন যে, অনেকেই কাজ ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন। বস্তুত, কেরলে বামেদের বিরুদ্ধে সংঘকে যতটা লড়াই করতে হয়েছে, বাংলায় তার চেয়েও বহুগুণ বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে ‘শাখা’ চালানো একপ্রকার দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাঠ বন্ধ, শৌচাগারে তালা— সব সামলেও কর্মীরা শারীরিক সংঘাতে না জড়িয়ে নিঃশব্দে বাড়ি বাড়ি জনসংযোগে জোর দেন। ভয় দেখিয়ে যে ভোট বৈতরণি পার হওয়া যায় না, সেটা প্রমাণ করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।

সংঘের ‘বিদ্যা ভারতী’ পরিচালিত প্রায় ৩০০টি ‘সারদা শিশু তীর্থ’ স্কুলের অবস্থাও ছিল সংকটজনক। বারবার প্রশাসনিক তল্লাশি ও অনুমোদন বাতিলের হুমকিতে তিতিবিরক্ত হয়ে নামের শেষে ‘পাবলিক স্কুল’ জুড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আজ রাজ্যে প্রতিদিন দেড় হাজারেরও বেশি শাখা অনুষ্ঠিত হয়, যা মানুষের মনে নিঃশব্দে শিকড় ছড়িয়েছে।

এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ঘটনায়। ২০০১ সালে সেখানে পাঁচজন স্বয়ংসেবকের ওপর ভয়াবহ হামলায় চারজন মারা যান। সেই হামলায় একমাত্র জীবিত ব্যক্তি বিকর্ণ নস্কর ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে গোসাবা থেকে জয়লাভ করেছেন। তাঁর এই জয় আসলে বাংলায় সংঘ পরিবারের ছাই থেকে উঠে আসার এক জ্বলন্ত প্রতীক।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক জনাদেশ কোনও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আসেনি। এটি আধুনিক, তথ্যনির্ভর এবং সুসংগঠিত ভোট-কৌশলের এক দুর্দান্ত নিদর্শন। যে মেরুকরণের তাস শাসকদল পরোক্ষভাবে খেলেছিল, সংঘ পরিবার তাকেই নিজেদের ব্রহ্মাস্ত্র করেছে। আকাশপথের প্রচারের চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা কর্মীদের ঘামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল জয়ের পেছনে কোনও অতিপ্রাকৃত ম্যাজিক নেই, আছে শুধু মাটি কামড়ে পড়ে থাকা হাজার হাজার অচেনা কর্মীর নিরলস পরিশ্রম, তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ এবং এক মনস্তাত্ত্বিক ব্লু-প্রিন্ট, যা বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে চিরকালের মতো বদলে দিয়েছে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *