শীতের আমেজ আসতে না আসতেই বাড়তে শুরু করেছে সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সমস্যা। ঋতু পরিবর্তনের সময়ে তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার হেরফেরের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে শিশু, প্রবীণ এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের। সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে ব্রঙ্কাইটিস, এমনকী নিউমোনিয়াও হতে পারে। তাই উপসর্গকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। বিস্তারিত জানালেন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ হোমিওপ্যাথির আন্তর্জাতিক সভাপতি ও প্রখ্যাত হোমিও-চিকিৎসক ডাঃ প্রকাশ মল্লিক
সংক্রমণ ছড়ায় কীভাবে?
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের অন্যতম কারণ বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু হলে চোখ লাল হওয়া, বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে জল পড়া, মাথা ভার লাগা, গলায় অস্বস্তি এবং জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সব সংক্রমণই ভাইরাসের কারণে হয় না। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও হতে পারে।
আরও পড়ুন:
শ্বাসযন্ত্রের উপরের অংশে সংক্রমণ হলে ফ্যারিঞ্জাইটিস ও ল্যারিঞ্জাইটিসের মতো সমস্যা দেখা যায়। ফ্যারিঞ্জাইটিসে গলার পিছনের অংশে প্রদাহ হয়। অন্যদিকে, ল্যারিঞ্জাইটিসে স্বরযন্ত্রে প্রদাহের কারণে গলা ভেঙে যেতে পারে বা স্বর বসে যেতে পারে। সংক্রমণ শ্বাসনালির আরও নীচের দিকে পৌঁছলে ব্রঙ্কাইটিস হতে পারে। আর ফুসফুসের বায়ুথলিতে সংক্রমণ ছড়ালে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া।
আরও পড়ুন:

কখন প্রয়োজন অ্যান্টিবায়োটিক?
গলা ব্যথা বা জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন নেই। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তবে স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে স্ট্রেপ থ্রোট হতে পারে। পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয়।
স্ট্রেপটোকক্কাস সংক্রমণের যথাযথ চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে রিউমেটিক ফিভারের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে হৃদযন্ত্রের ভালভের উপর। আবার সংক্রমণের পর কিডনিতেও প্রদাহ হতে পারে।
সর্দি-কাশি হলেই নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ভাইরাসজনিত। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক কফ পাতলা করার ওষুধ বা ব্রঙ্কোডায়ালেটর দিতে পারেন। শ্বাসনালি সংকুচিত হলে ইনহেলারের প্রয়োজন হতে পারে। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে বিশেষ সতর্কতা জরুরি।
নিউমোনিয়াকে অবহেলা নয়
সংক্রমণ ফুসফুসে পৌঁছলে নিউমোনিয়া হতে পারে। জ্বর, কাশি, কফ, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং দুর্বলতা এর পরিচিত উপসর্গ। বুকের এক্স-রে করলে ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে সাদা ছোপ বা ছায়া দেখা যেতে পারে। তবে শুধু এক্স-রে নয়, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য পরীক্ষার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা হয়।
সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা জরুরি
সর্দি, কাশি ও জ্বর একাধিক সংক্রমণের সাধারণ উপসর্গ। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নির্দিষ্ট করা কঠিন। কাশি বুকের গভীর থেকে উঠছে কি না, শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে কি না, জ্বর কতদিন থাকছে, সেগুলি খেয়াল করা জরুরি।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বুকের এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা বা নির্দিষ্ট ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করার পরীক্ষা করাতে পারেন। বায়োফায়ার প্যানেলের মতো মলিকিউলার পরীক্ষায় একসঙ্গে একাধিক রোগজীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব। এতে সংক্রমণের কারণ বুঝে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলেও পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। টিকা নেওয়া থাকলেও সংক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিরোধেই বাড়তি সুরক্ষা
শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, সিওপিডি-র রোগী এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লু ভ্যাকসিন সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি অসুখের তীব্রতা ও জটিলতার আশঙ্কাও কমাতে পারে।
পর্যাপ্ত জল পান করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। ধূমপান এড়িয়ে চলতে হবে। বাইরে বেরলে প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করুন। বিশেষ করে ভিড় বা বদ্ধ জায়গায় মাস্ক সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। হাঁচি-কাশির সময়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যেসও বজায় রাখতে হবে।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রসঙ্গে
কারণ, উপসর্গ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও সামগ্রিক অবস্থা বিচার করে ওষুধ দেওয়া হয় এবং তাতে যথেষ্ট ভালো সুফলও মেলে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
