শিলপাটা ধার দেওয়ার সেই ডাক ফিরুক – Uttarbanga Sambad

শিলপাটা ধার দেওয়ার সেই ডাক ফিরুক – Uttarbanga Sambad

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


  • রণজিৎ কুমার মিত্র

ঠুংঠাং ঢং ঢং কত ব্যথা বাজেরে। যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে এটা সুকুমার রায়ের ‘শব্দকল্পদ্রুম’–এর অংশ। শব্দ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার হারিয়ে যাওয়াটা কষ্টের বৈকি! গোচরে, অগোচরে কতই না শব্দ আমাদের জীবন থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। সেই পর্বে জড়িয়ে কত মান–অভিমানের গল্প।  মায়ের হাতভর্তি চুরির রিনঠিন, ঠাকুমা-ঠাকুরদার জন্য হামানদিস্তায় পান থেঁতো করা। রান্নাঘরে মশলা পেষার সময় শিলনোড়ার দাপুটে হুংকার বা কাপড় কাচার সময় সেই অদ্ভুত ধুপধাপ আওয়াজ। আমরা আধুনিক হচ্ছি। আড়ালে মন ভালো রাখা কত কিছুকেই না হারিয়ে চলেছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘আমি যখন পাঠশালাতে যাই /আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে/ দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই/ ফেরিওয়ালা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে/ চুড়ি চাই চুড়ি চাই সে হাঁকে/ চীনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে।’ সত্যিই, একটা সময় ঘরবন্দি শিশু-কিশোরদের কাছে ফেরিওয়ালারা ছিল এক আশ্চর্য স্বপ্নের সওদাগর। সুরে-বেসুরে ফেরিওয়ালাদের সেই হাঁক, ঘরবন্দিদের পাশাপাশি পরিবারের সবার জন্যই তা নিয়ে আসত একরাশ মুগ্ধতা। ঠাকুমা কান খাড়া করে থাকতেন কখন শোনা যাবে, ‘ঘষি (ঘুঁটে) লেবে গো!, বা ‘শিলপাটা ধার করাবে!’, বা ‘মাটি লেবে গো!’ বাড়ির মেয়েদের পাশাপাশি নতুন বৌ অপেক্ষায় থাকত কবে আলতা সিন্দুর ফিতের পসরা সাজিয়ে হাসিমুখে এসে কেউ বলবে, ‘ফিতে সিন্দুর লেবে গো দিদি!’ প্রতি রবিবার এক বালক কৌটায় চাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত কখন শোনা যাবে ‘এ মাই ভিখ দিবি না!’ শুনে জেঠিমার ঝংকার,  ‘আ মোলোগে ও বেটা আবার এসেছে’। দইওয়ালার ডাক শুনে অমল যদি সাড়া না দিল বাংলা সাহিত্যে এক ক্লাসিক হয়তো সৃষ্টিই হত না। কার্তিক মাস পড়লেই সকালে প্রভাতফেরির খোলকীর্তনের আওয়াজে। সকালে বৈরাগী দাদার একতারা বাজিয়ে গান ‘শোনোগো আয়ান দাদা, তোমার ছিমতি রাধা জাত কুল মান আর আচার বিচার কিছুই রাখল না।’ সেসব গানের অর্থ কিছু বুঝতাম না, ঠাকুমা মা জেঠিমাদের হাসিঠাট্টার আওয়াজ কানে আসত। মনে মনে ভাবতাম বড় হয়ে সে সবের অর্থ একটা দিন ঠিকই বুঝে নেব।

সংসারে একটা সময় ঘুঁটে দিয়ে রান্না হত, এঁটেল মাটি দিয়ে উনুন লেপা হত। শিলপাটা ধার করিয়ে মশলা পেষা হত। তারপর এল কেরোসিন স্টোভ, ইকমিক কুকার, কলিং বেল, রেডিও, টিভি। সংসারের কোণে কোণে তখন কত রকমের আওয়াজ যে ঠাঁই। দূরদর্শনের সেই মন ভালো করা সিগনেচার টিউন, দিনের গোড়ায় অদ্ভুত মন ভালো করা সুরে আকাশবাণীর পথ চলা শুরু। সে সব দারুণ ভালো লাগত। আবার খুব ভয় লাগত শবযাত্রার ‘হরিবোল’ ধ্বনিতে। আজকাল লাগে না। লাগবেই বা কী করে। আজকাল শেষ যাত্রায় ‘হরিবোল’ দেওয়ার লোকই তো কমে গিয়েছে। ডাক পেলেই শববাহী গাড়ি গীতার শ্লোক বাজিয়ে বাড়ির গেটের সামনে হাজির। ঠাকুমা বলতেন ‘থালা-বাসন একসঙ্গে থাকলে ঠুকঠাক লাগে।’ আমাদের সেইসব ‘ঠুকঠাক’ কবেই তো ঘুচে গেছে কয়েকশো বর্গফুটের ফ্ল্যাটবাড়িতে এসে। দরজায় কড়া নেড়ে এখন আর কেউ বলেন না ‘অবনী বাড়ি আছ’? বরং ‘কলিং-এর ঘণ্টা শুনে’ বারান্দায় রোদ্দুর পোহাতে পোহাতে হারানো সুর ভাজি ‘তোমার দেখা নাই গো, তোমার দেখা নাই’। মানুষে মানুষে দেখাদেখি দ্রুত কমে যাচ্ছে। আগে মানুষে মানুষে কত কথা হত। আজকাল হয় না। না বলা কত শব্দ ভূমিষ্ঠ হওয়ার সুযোগটুকু পায় না।

হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অবশ্য অনেক আগমনও আছে। শব্দ সংক্রান্ত কত যন্ত্র দেখলাম এ জীবনে। ফোনোগ্রাম, গ্রামোফোন, মাইক্রোফোন, টেপরেকর্ডার থেকে মুঠোফোনের ভয়েস রেকর্ডার পর্যন্ত। শব্দ নিয়েই তাদের পথ চলা। শব্দ আছে বলেই মানুষের সংস্কৃতি আর সংস্কৃতির চলমানতা আছে। ইংরেজিতে যাকে বলে semantics। বাংলায় ‘শব্দার্থতত্ত্ব’, ‘বাগর্থবিজ্ঞান’। ভাষাবিজ্ঞানের ক্লাসে আমাদের মাস্টারমশাইরা সেসব খুব সরস করে পড়াতেন আর বোঝাতেন, একই শব্দ সময়ের স্রোতে ভেসে ভিন্ন পরিবেশে, কীভাবে ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। একদা ‘মহাজন’ শব্দটি ছিল ‘মহান ব্যক্তি’, সময়ের পরিবর্তিত অর্থে যা হয়ে দাঁড়াল সুদখোর। ‘ধীবর’ শব্দটির মূল অর্থ ছিল বুদ্ধিমান ব্যক্তি এখন তা ‘জেলে’। সংবাদের পরিবর্তে ‘সন্দেশ’ হয়েছে মিষ্টান্নবিশেষ। হাজার বছর বয়সি বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে কত শত -সহস্র শব্দ এল গেল। গ্রিক, পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, আরবি, তুর্কি তো আছেই, ইংরেজির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের ভারতীয় ভাষা থেকে আসা শব্দ বাংলার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। শব্দের সমাহারেই মানুষের ভাষার সৃষ্টি।

দুনিয়ার যে প্রান্তেই মানব শিশু যখন জন্মায় তার কোনও ভাষা থাকে না, সে যত বড় হতে থাকে ততই শব্দ শুনে শুনে অনুকরণ করে ভাষা আয়ত্ত করে। শব্দের বদল ঘটে বানানে-অর্থে-ধ্বনিতে।  শব্দই বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের যোগসূত্র। কবি, সাহিত্যিকরা তাঁদের সৃজনের তাগিদে কত নতুন নতুন শব্দ তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্রন্দসী’, ‘অমলতাস’, ‘বনপুলক’, ‘সোনাঝুরি’, ‘হিমঝুরি’, ‘মধুমঞ্জুরী’, ‘নীলমণি লতা’, ‘বাসন্তিকা’। সুকুমার রায়ের ‘বকচ্ছপ’, ‘হাঁসজারু’।  সাহিত্যে-সংবাদপত্রে-সমাজে রোজই নিত্যনতুন শব্দের সৃষ্টি অব্যাহত।

শব্দ নিয়ে লিখতে গিয়ে রাধাপ্রসাদ গুপ্তর লেখা বই ‘কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ’–এর বইটির কথা মনে পড়ল। রাধাপ্রসাদের শ্রবণ সংগ্রহের শব্দগুলো শুধু কলকাতার নয়, বহু শহরের -গ্রামীণ জীবনের, পরিবার সামাজিক পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।  সময় যতই গড়াচ্ছে সব কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। আজকের জেঠুরা সেই রাশভারী শব্দ প্রয়োগে ডাকাডাকি করেন। কেউ করতে গেলে বাবারা পালটা দিতে পারেন যে। আজকের বাবাদের গলার স্বর যে বেশ ভারী। অথচ আগেকার বাবারা হলে! পিতৃসম দাদার সামনে কোনও রা কাড়া তো দূরের বিষয়, মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসও পেতেন না। ছোটবেলায় ডাকনামে ডাকা বন্ধুদের আজ দেখা যায় না। বিকেলবেলায় খেলার মাঠে যাওয়ার সেই ডাক আজ উধাও। পাড়ার সুন্দরী তনয়া রাস্তায় নামলে কতজনের বুকে চিনচিন শব্দ স্পষ্ট টের পাওয়া যেত। ‘কে তুমি নন্দিনী’ বলে তাদের কেউ কেউ গেয়েও উঠত। আজকাল কেউ গায় না। গাইবেই বা কী করে। ‘জীবনে কী পাব না’ বলে হিসেব না মিলিয়ে আজকাল সবাই মুঠোফোনের দাপুটে শব্দের জগতে বুঁদ।

তবুও জীবন স্বপ্ন দেখে। আমরাও স্বপ্ন দেখি। অমলরাও। দইওয়ালাদের সেই ‘দই চাই, দই’ হারিয়ে গেলে যে আমাদেরই ক্ষতি। জীবন স্বপ্নহীন হবে। তাই সমস্ত শব্দ আমাদের সঙ্গী হোক। আজীবন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *