রাহুল দাস
ভারতে ধর্ষণ শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখে ভেসে ওঠে একজন নারী- যিনি শিকার, আর অপরাধী একজন পুরুষ। কিন্তু বাস্তবতা কি এমনই একরৈখিক? ভারতীয় আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, দুর্ভাগ্যবশত ‘হ্যাঁ’। কারণ আজও ফৌজদারি বিধি ধর্ষণকে কেবল পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর সংঘটিত অপরাধ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করে। অথচ বাস্তবতা বলছে, যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারেন যে কোনও মানুষ- নারী, পুরুষ কিংবা রূপান্তরকামী (ট্রান্সজেন্ডার)।
২০১৩ সালে আইন সংশোধন করে ‘ধর্ষণ’-এর সংজ্ঞা কিছুটা পরিবর্তিত হলেও, তাতে কিন্তু পুরুষ বা রূপান্তরকামী ভুক্তভোগীকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই লিঙ্গভেদের কারণে, যাঁরা ভুক্তভোগী হচ্ছেন, তাঁদেরকে আইনিভাবে কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে- সেটার কাঠামো অনেকটা অস্পষ্ট। ফলস্বরূপ, বর্তমান পরিবর্তিত আইনেও অনেকটা স্পষ্ট- পুরুষ কেবল অপরাধী হতে পারেন, ভুক্তভোগী নন। ফলে যদি কোনও নারী জোর করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করেন, সেটি আইনি ভাষায় ‘ধর্ষণ’ নয়, বরং অন্য ধারায় বিচার্য- যার শাস্তি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া লঘু ও ভিন্ন।
আইনের এই একপেশে কাঠামো ন্যায়বিচারের পরিসরকে সীমিত করে দিয়েছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, পুরুষ বা অন্য লিঙ্গের মানুষ যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারেন না। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, বহু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জীবনের কোনও পর্যায়ে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের শিকার হয়েছেন। তবু এই ঘটনাগুলি কোথাও ‘ধর্ষণ’-এর পরিসরে ধরা পড়ে না। সরকার প্রদত্ত অপরাধ-পরিসংখ্যানে পুরুষ বা রূপান্তরকামী ভুক্তভোগীদের জন্য আলাদা কোনও শ্রেণি নেই। অর্থাৎ যে অপরাধ বিদ্যমান, তার হিসাব নেই। আর হিসাব না থাকলে নীতিনির্ধারণও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক কলঙ্কের ভয়েই অধিকাংশ পুরুষ নীরব থাকেন- আর সেই নীরবতা বাড়ায় অপরাধীর শক্তি।
শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে কিন্তু আইন লিঙ্গনিরপেক্ষ (পকসো আইন)। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য হবে না কেন? বয়স বেড়ে গেলে কি মানবাধিকারের পরিধি সংকুচিত হয়?
বিচার ব্যবস্থার একাংশ বহুবার এই বৈষম্যের পরিবর্তন চেয়েছে, কিন্তু সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে বিষয়টি এখনও ট্যাবু। অনেকে আশঙ্কা করেন, আইন লিঙ্গনিরপেক্ষ হলে মিথ্যা অভিযোগ বাড়বে। কিন্তু বর্তমান আইনে কি সেই আশঙ্কা নেই? অসংখ্য পুরুষ কিন্তু মিথ্যা কেসে ফাঁসছেন। এখন সময় এসেছে আইনকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর। ধর্ষণের সংজ্ঞা ‘লিঙ্গনিরপেক্ষ’ না হলে বহু ভুক্তভোগী সারাজীবন বিচারবঞ্চিত থাকবেন। এনসিআরবি-এর রিপোর্টিং পদ্ধতিতে নতুন ক্যাটিগোরি যোগ করতে হবে, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং সাপোর্ট সেন্টার গড়ে তুলতে হবে- যেখানে লজ্জা নয়, নিরাপত্তা হবে মুখ্য।
সমাজে এখনও পুরুষের দুর্বলতা মানা হয় না, তাই পুরুষ ভুক্তভোগীর কষ্ট উপহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই মানসিকতাকে বদলানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু পরিবর্তন যদি হয়, তবে তা আইন থেকেই শুরু করতে হবে। ধর্ষণ কোনও লিঙ্গের নয়, এটা ক্ষমতার, নিয়ন্ত্রণের, অপমানের অপরাধ। আর সেই অপরাধের মুখ লুকিয়ে রাখা মানে ন্যায়ের দরজা অর্ধেক বন্ধ রাখা। ভারত যদি সত্যিই সমতার কথা বলে, তবে এখনই সময়- ‘ধর্ষণ’ শব্দটার চারপাশ থেকে লিঙ্গের দেওয়াল সরিয়ে দিয়ে তাকে মানবাধিকারের পরিপূর্ণ অর্থে সংজ্ঞায়িত করা।
(লেখক অক্ষরকর্মী। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা।)
