রিয়ালের পতনে লাগল আগুন

রিয়ালের পতনে লাগল আগুন

শিক্ষা
Spread the love


 

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

একটা দেশে তার জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন কোন তলানিতে এসে ঠেকেছে জানলে স্রেফ শিউরে উঠতে হয়। ভাবা যায়, টালমাটাল পরিস্থিতিতে দিশেহারা ইরানে এই মুহূর্তে এক ডলারের সরকারি বিনিময় মূল্য ৪২ হাজার রিয়াল? আর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে খোলা বাজারে ডলার আরও ৩৫ গুণ দামি– কল্পনা করুন, ১ মার্কিন ডলার = ১৪,৫০,০০০ (সাড়ে ১৪ লক্ষ) রিয়াল! ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে বিগত প্রায় অর্ধ শতকে রিয়ালের দাম পড়েছে ২০ হাজার গুণ! ঠেকানোর কেউ নেই। এই পরিস্থিতিতে চাল, চিনি, ভোজ্য তেল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কোথায় যেতে পারে সহজেই অনুমেয়। আর এমন মুদ্রাস্ফীতির দাপটে রোজগেরে মানুষের বেতনের তো কোনও মূল্যই নেই! অথচ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আবার যখন জারি হল ২০১৮ সালে তখনও ডলারের দর ছিল ৫৫ হাজার রিয়াল। অর্থাৎ গত ৭-৮ বছরের মধ্যে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। সুতরাং সামাজিক মর্যাদা খোয়ানো ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ আর হতাশা জমে উঠছিল।

পুরোভাগে ব্যবসায়ীরা

খামেনেই জমানার বিরুদ্ধে অতি সম্প্রতি ইরানে যে জনরোষ ফেটে পড়েছে তার সূচনা নতুন বছর শুরুর ঠিক চারদিন আগে। গত ২৮ ডিসেম্বর রবিবার তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীরা সব দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল শুরু করে দিলেন। ব্যবসায়ীদের স্থানীয় পরিচিতি ‘বাজারি’ নামে। ডলারের সাপেক্ষে রিয়ালের বিনিময়মূল্যে চরম অস্থিরতা চলতে থাকায় বাজারিদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বাজারিরা খুব ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী। দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শাসকদের এরাই বরাবর মদত জুগিয়ে এসেছে। আবার এরা সমর্থন তুলে নেওয়াতেই পতন ঘটেছিল একনায়কতন্ত্রী শাহ জমানার। কাজেই বাজারিদের হরতালের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তেহরানে তো বটেই, ক্রমে ইরানের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমের শহরগুলিতে দলে দলে মানুষ পথে নেমে আসে। শুরু হয়ে যায় সরকার-বিরোধী প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। ওই এলাকাগুলিতে প্রধানত কুর্দ, লুরি, আরব ও তুর্কি সংখ্যালঘুদের বাস। রায়ট পুলিশের গুলিতে নিহত হতে থাকে প্রতিবাদকারীরা। আর বিক্ষোভের মাত্রাও বাড়তে বাড়তে অন্তত ৩০টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদে শামিল হয় বেকার যুব সম্প্রদায়, সামান্য বেতনের কর্মী সহ হাজারে হাজারে সাধারণ মানুষ। অর্থনৈতিক প্রতিবাদ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের চেহারা নেয়।

 পেট্রোল ও বাজেট ইন্ধন

অবশ্য হরতালের পিছনে ইন্ধন জুগিয়েছে নিছক রিয়ালের পতন নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি প্রধান কারণ — পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং জনবিরোধী বাজেট। সস্তায় পেট্রোল মেলার অন্যতম দেশ হল ইরান। প্রতি মাসে সরকারিভাবে ১৫ হাজার রিয়ালের বিনিময়ে পাওয়া যায় ৬০ লিটার পেট্রোল আর ৩০ হাজার রিয়ালে ১০০ লিটার। ২০১৯ থেকে দাম বেঁধে রাখা রয়েছে একই জায়গায়। গত ডিসেম্বরেই সেখানে তৃতীয় একটি স্তরের সূচনা করে বলা হয়েছে, যাঁদের মাসে ১৬০ লিটারের বেশি পেট্রোল লাগছে তাঁদের লিটার পিছু দিতে হবে ৫০ হাজার রিয়াল। আবার নতুন বাজেটে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক, বাঘা বাঘা ব্যবসায়ী ও বড় কোম্পানিগুলির ওপর উচ্চ হারে কর চাপানো হয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারিরা এতে চটে লাল। কারণ, বাজারের অলিতে-গলিতে দোকানের বাইরেও তাঁদের কোটি কোটি ডলারের লেনদেন। নতুন দুটি পদক্ষেপেই তাঁদের স্বার্থহানি। বিত্তবান বাজারিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনই সরকার অনুগত ‘পাসদারান’ বা ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হানায় নিরস্ত্র ‘সন্ত্রাসবাদী’দের মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে।

ট্রাম্পের কূটনীতি

ইরানে যখন এত মুদ্রাস্ফীতি, তখন খামেনেই ইসলামিক সরকার দেশের সীমিত আর্থিক সম্পদও পারমাণবিক প্রকল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজে লাগাতে মরিয়া। আর মার্কিন ও পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিক সংকট হয়ে উঠছে আরও সঙ্গিন। তাই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক ক্ষোভ, হতাশা। ইরানের প্রতিবাদীদের উদ্দেশে সরাসরি ইন্ধন জুগিয়ে বার্তা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প — দেশপ্রেমী ইরানি প্রতিবাদকারী, আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। পারলে আপনাদের আশপাশের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করুন। ইজরায়েলের নেতানিয়াহুও প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ইরানি শাসকদের বিরুদ্ধে সামরিক হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রতিবাদীদের কণ্ঠে খামেনেই-বিরোধী স্লোগান- ‘নিপাত যাও’। আর খামেনেইও বিগত কয়েক দশক ধরে ধ্বংস করতে চেয়েছেন আমেরিকাকে। প্রতিবাদীদের বিক্ষোভে ধুয়ো দিয়ে ইরানে ইসলামিক জমানার পতন ঘটাতে পারলে তো আমেরিকার সোনায় সোহাগা। ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গদিচ্যুত করতে পেরে ট্রাম্পের উৎসাহ বেড়ে গিয়েছে। এবারে যদি কিউবা এবং ইরানকে বাগে আনা যায় তাহলে ট্রাম্পকে পায় কে!

সন্দেহ নেই, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, মোল্লাতন্ত্রের অপশাসন এবং ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়ার জেরে  তেহরান ও অন্যান্য শহরে জনতা ক্ষোভে ফুটছে। তবে তার মানে এই নয় যে ইরানি প্রতিবাদীরা কোনও বিদেশি অ্যাজেন্ডা অনুসরণ করছে অথবা তারা মার্কিন বা ইজরায়েলি হস্তক্ষেপের প্রত্যাশী। বরং গত বছর ইজরায়েল ও আমেরিকা যখন ইরান আক্রমণ করে তখন খামেনেইপন্থী ও বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে আন্তর্জাতিক হানার প্রতিবাদ করেছে। মনে রাখতে হবে গত বছর জুনে তেহরানের এভিন কারাগারের ওপর ইজরায়েলের মারাত্মক হানায় ৮০ জন নিহত হয়েছিল। ইজরায়েলের ছেঁদো যুক্তি ছিল, ওই জেলখানা থেকে তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি চালানো হচ্ছিল। পরে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ঘোষণা করে, ওই আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। কাজেই ইরানের জনতা আমেরিকা ও ইজরায়েলকে হাড়ে হাড়ে চেনে। আর শুধু আমেরিকা-ইজরায়েল কেন, ১৯৮০ সালে ইসলামিক বিপ্লব পরবর্তী বিশৃঙ্খলা থেকে ফায়দা লুটতে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন যখন ইরান আক্রমণ করেছিলেন তখনও ইরানিরা একজোট হয়ে বিদেশি আগ্রাসন প্রতিহত করেছিল।

সম্পর্কের অবনতি

ইরান সরকার বিক্ষোভ আন্দোলনকে আপাতত কিছুটা সামাল দিতে পারলেও সাম্প্রতিক ঘটনা দেশের শাসনতন্ত্রের প্রথাগত কিছু দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। মোল্লাদের সঙ্গে বাজারিদের বোঝাপড়া বেশ ভালোই বজায় ছিল। তবে বিগত দুই দশকে সুসম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ, আইআরজিসি এবং ‘বনিয়াদ’ বা সাবেক যুদ্ধ সৈনিক, সেনা-বিধবা ও অনাথদের কল্যাণে গঠিত দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি বিভিন্ন ব্যবসা, ম্যানুফ্যাকচারিং ও ঠিকা কাজের লোভনীয় সব বরাত দখল করেছে। বাজারিদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের একটি চুক্তি নাকি হয়েছে। তবে বাজারিদের খুশি করতে প্রবল প্রভাবশালী আইআরজিসি নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ কাটছাঁট করতে রাজি হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় ৮ কোটি নাগরিকের প্রত্যেকের জন্য ইরান সরকার আগামী চার মাস ধরে এক কোটি রিয়াল (৭ ডলার) মাসোহারা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই ব্যবস্থায় গণবিক্ষোভের স্থায়ী সমাধান না হওয়ারই আশঙ্কা। মনে রাখা দরকার, আধুনিক ইরানি প্রজন্মের দুই তৃতীয়াংশের জন্ম ইসলামিক বিপ্লবের পরে। প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলির দৌলত তাদের নজর এড়াচ্ছে না, পাশাপাশি নিজেদের দুরবস্থার জন্য তারা দুষছে দেশের মোল্লাতন্ত্রকে। চরমপন্থী মৌলবীদের দখলে সংসদ ও বিচারব্যবস্থা। প্রশাসন কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ। নারী সম্প্রদায়, অ-শিয়া সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং নানা সামাজিক মহল নিজেদের অবহেলিত ও প্রান্তিক মনে করছে।

নজর ভারতেরও

ইরানের এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প কী চাল চালেন সেটাই দেখার। মার্কিন হানাদারির জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থপুষ্ট যে কোনও লক্ষ্যবস্তু ইরান সহজে ধ্বংস করতে পারে। তাতে কী খেসারত দিতে হয় ভেবে উপসাগরীয় দেশগুলি আতঙ্কিত। তেমন কোণঠাসা হলে আবার ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। তখন পেট্রো পণ্যের দাম হবে আকাশছোঁয়া। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চিন ও দুবাই দিয়ে তেল চোরাচালানে ইরান পারদর্শী। কাজেই আমেরিকাও বুঝে খেলবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগামী দিনে তেহরানের বৈঠক কি হবে?

ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে ভারতের স্বার্থও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ রাখতে গেলে ভারত তো ইরানকে এড়িয়ে চলতে পারবে না। আবার ইরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকলে আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে ভারতের অসামরিক বিমান চলাচলের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। ভারতে বসবাসকারী শিয়াপন্থী মুসলমানের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। সুতরাং ইরানে যা ঘটবে তার আঁচ ভারতে পড়বেই। আবার এমন সব আশঙ্কার বাইরে আশার কথা হল, অদূর ভবিষ্যতে ইরানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে, জমানা বদল হলে কিংবা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ভারতের সামনে খুলে যাবে অমিত অর্থনৈতিক উন্নতির সম্ভাবনা। পারস্যের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের ইতিহাস কারও অজানা নয়।

(লেখক প্রাবন্ধিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *