রাহুল দাস
বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং গবেষণার মানদণ্ড নির্ধারণে ইউজিসি-নেট কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষার বৌদ্ধিক মানচিত্র তৈরির প্রধান কারিগর। এই পরীক্ষার মাধ্যমে যে গবেষক ও শিক্ষক সমাজ উঠে আসে, তাঁদের বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে আগামীর সমাজবিজ্ঞানের দিশা। ফলে প্রশ্নপত্রে বিষয়গত গভীরতা ও ধারণাগত স্পষ্টতা বজায় রাখা অপরিহার্য। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর সেশনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্নপত্র সেই প্রত্যাশা পূরণে চরম ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
মুখস্থবিদ্যার একাধিপত্য
এবারের প্রশ্নপত্রের পরিসংখ্যান অত্যন্ত হতাশাজনক। রিডিং কমপ্রিহেনশনের ১০টি প্রশ্ন বাদ দিলে, বাকি ৯০টির মধ্যে ৬৭টিই ছিল নিছক তথ্যভিত্তিক। এর মধ্যে প্রায় ২৪টি প্রশ্ন ছিল এমন স্তরের, যা বিষয় বোঝার ক্ষমতা নয়, বরং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য মুখস্থ রাখার ক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে। মাত্র ২৩টি প্রশ্নকে কোনওভাবে জাতীয় স্তরের অ্যাকাডেমিক মানের কাছাকাছি বলা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান কোনও ‘জেনারেল নলেজ’ প্রতিযোগিতা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, লোকপ্রশাসন বা রাষ্ট্রচিন্তার মতো বিষয়গুলি বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক বোধ তৈরি করে। এখানে প্রশ্ন হওয়ার কথা ‘কীভাবে’ ও ‘কেন’— কেবল ‘কী’ নয়। অথচ এবারের পরীক্ষায় ধারণাগত বিশ্লেষণকে নির্বাসিত করে যান্ত্রিক স্মৃতিপরীক্ষাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়ান পলিটি থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তা— প্রতিটি ইউনিটেই দেখা গেছে গভীর ভাবনার চেয়ে তথ্যের আধিক্য। একজন হবু অধ্যাপক প্লেটোর সাম্যবাদ বা কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ থিওরি তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু জানেন, তার চেয়ে তিনি কত সালে সেটি লেখা হয়েছে তা মুখস্থ করেছেন কি না, সেই বিচারই যেন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো একটি প্রগতিশীল বিষয়ের মূল দর্শনের পরিপন্থী।
শিক্ষক নিয়োগে সংকটের মেঘ
ইউজিসি-নেটের মাধ্যমে নির্বাচিত সহকারী অধ্যাপকরাই আগামীদিনে শ্রেণিকক্ষে নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু প্রশ্নপত্র যদি এমন হয় যেখানে বিশ্লেষণী মেধার কোনও মূল্যায়ন নেই, তবে তারা ভবিষ্যতে যোগ্য শিক্ষক বাছাই করতে পারবে কি না— সে প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যাঁরা গত কয়েক বছর ধরে সিলেবাস অনুযায়ী গভীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এই প্রশ্নপত্র তাঁদের কাছে মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের কাছেই এটি অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নের চেয়ে প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক নির্মম ছেলেখেলা। যখন কোনও যোগ্য প্রার্থী দেখেন যে তাঁর বছরের পর বছর অর্জিত পাণ্ডিত্য কেবল একটি সাল বা তারিখের ভুলে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস উঠে যাওয়া স্বাভাবিক।
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও দায়বদ্ধতা
ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা লিখিতভাবে আপত্তি জানালে কর্তৃপক্ষের তরফে ‘পুনর্বিবেচনা’ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একটি জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় যদি বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে একই অভিযোগ তোলেন, তবে দায় এড়িয়ে গিয়ে সেই ভার পরীক্ষার্থীদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। এর ফলে প্রার্থীরা যে সময়, অর্থ ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তার দায়ভার কে নেবে? বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকা থেকে আসা পরীক্ষার্থীদের কাছে একবার পরীক্ষায় বসা মানে বিশাল এক আর্থিক ও শারীরিক যুদ্ধের শামিল।
সময়ের দাবি
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে তথ্যের কারাগারে বন্দি করা মানে সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক দর্শনকেই আঘাত করা। উচ্চশিক্ষার স্বার্থে ইউজিসি-কে দ্রুত এই ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। প্রশ্নকর্তাদের বুঝতে হবে যে, মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তথ্যের ভারে হয় না, হয় চিন্তার স্বচ্ছতায়। অন্যথায়, উচ্চশিক্ষা কেবল একটি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিণত হবে এবং মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থবিদ্যার চাপে পিষ্ট হয়ে বিদ্যাসৃজন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আঞ্চলিক ও জাতীয় উভয় স্তরেই এই বৌদ্ধিক অবক্ষয় রুখতে কর্তৃপক্ষের গঠনমূলক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
(লেখক তুফানগঞ্জের বাসিন্দা)
