অনিন্দিতা গুপ্ত রায়
লোকটাকে মাঝে মাঝে মনে পড়ে। সেই যে সুকুমার রায়ের ‘রাজার অসুখ’ গল্পের পাগলাটে লোকটা, যার এই পৃথিবী নামক নাট্যশালার রঙ্গ দেখে ভারি আমোদ হত আর হেসে কুটিপাটি হত। সেই হাসির কারণ জেনে রাজামশাইয়ের অসুখ-বাতিক ঘুচে গিয়েছিল চিরতরে। প্রতিদিনের জীবনযাপনের রঙ্গতামাশা আমাদের চারপাশে আসলে চলতেই থাকে অনবরত। আমরা ঠিকমতো সেগুলো ঠাহর করি না সবাই। করলে দেখা যায় ব্যাপারগুলো মোটেই তত সিরিয়াস কিছু নয়, বরং মস্ত তামাশার। শিবরাম চক্রবর্তীকে ধার করে বলাই যায় জীবনকে অত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই, কারণ এখান থেকে কেউ জীবন্ত ফিরে যায় না। তা যাঁরা আমাদের চারপাশের এই সারাক্ষণের ঘটমান বর্তমানকে খোসা ছাড়িয়ে হাস্যরসের মোড়কে আমাদের অসংগতিগুলো আমাদেরই সামনে তুলে ধরেন তাঁরা একরকম আয়নাবাহকের কাজ করেন বলা যায়। কৌতুক বা হাস্যরস কেবল ক্ষণস্থায়ী আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, সামাজিক সমালোচনা ও সংস্কারেরও হাতিয়ার। প্রাচীন গ্রিক নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, যে মোড়কেই হোক তা সমষ্টিগতভাবে চাপমুক্তির মাধ্যম। একেবারে গভীরে গিয়ে দেখলে, হাস্যরস আসলে ভয় বা অস্বস্তিকর বিষয়কে হাস্যকর করে আমাদের ওপর থেকে ভয়ের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। আমাদের কমফর্ট জোনে নিয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবে কৌতুক এমন একটি সমতার প্ল্যাটফর্ম যার মাধ্যমে শাসক রাষ্ট্র বা যে কোনও শক্তিশালী অবস্থানকে প্রকাশ্যে উপহাসের মধ্যে দিয়ে সমালোচনা করার অধিকার পাওয়া যায়। এই ভূমিকায় ‘প্রতিটি কৌতুকই আসলে একটি বিপ্লব,’ যেমন জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন। কিন্তু ‘অধিকার’ শব্দের পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও অবস্থান করে, তা হল ‘দায়িত্ব’। বহুক্ষেত্রে তিতিবিরক্ত নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার যা ক্ষেত্রবিশেষে আপসের আড়ালে চাপা থাকে, তারই বিস্ফোরণ হয় হাসির মধ্যে দিয়ে। এ একরকম পারগেশনও বটে।
নয়ের দশকে শুরু হওয়া নানা হাস্যরসাত্মক টেলিভিশন ধারাবাহিকের পাশাপাশি টক শো, লাফটার শো জনপ্রিয় হতে থাকে যেখানে উইট ও হিউমারের সঙ্গে মিশতে থাকে তীব্র স্যাটায়ার। তারপর সময় গড়িয়ে হাল আমলের নানারকম ব্লগ কনটেন্ট, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, মিম ও কৌতুক-রিল বা শর্টস। ক্রমে বিভিন্নরকম কমেডি ক্লাবের ট্রেন্ড হয়ে উঠতে শুরু করল মেট্রো-কালচারপোষিত প্রচুর সুযোগসুবিধাপ্রাপ্ত শহুরে উচ্চবিত্তদের দ্বারা তথাকথিত প্রান্তবাসী বা আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, উচ্চারণ ভঙ্গিমা, শরীরী ভাষা, কথায় আঞ্চলিক টান বা উপভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ধর্মীয় আচার ইত্যাদি বিষয়গুলিকে কৌতুকের ‘কনটেন্ট’ করে তোলা। আপাতদৃষ্টিতে এগুলিতে প্রচুর হাসির খোরাক দেখানোর চেষ্টা হলেও গভীরে থেকে যায় প্রবল সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ও নিজের উচ্চ ইগো-সন্তুষ্টির মতো মানসিকতা। এখন, প্রশ্ন ওঠে— এত পলিটিকালি কারেক্ট থেকে কি হাসানো যায়? তাহলে কি উপভোক্তাদের ধৈর্য বা রসিকতাবোধ দুই-ই কমে যাচ্ছে? মানুষ কি হাসতে ভুলে যাচ্ছে ক্রমশই, তাই ‘সামান্য বিষয়’ নিয়েই ক্রমাগত ট্রোলিং বা পাবলিক আউটরেজ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল? আপাত তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে ইদানীং বহু গণ আক্রোশ আছড়ে পড়ছে। এমনকি মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়কট, খুনের হুমকি এবং আইনি নোটিশ জারি হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে যে ইদানীং প্রতিটি কৌতুককে আক্ষরিক অর্থে একটি রাজনৈতিক ইস্তাহার বা চরম অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৌতুক অভিনেতাদের যে অতিরঞ্জন, ব্যঙ্গ বা অযৌক্তিকতার শৈল্পিক স্বাধীনতাটুকু থাকে, তা মেনে নিতে আজকের সমাজ নারাজ।
এই অভিযোগগুলির প্রেক্ষিতেই আঙুল কিন্তু অন্যদিকেও ওঠেই। কমেডি যেখানে পাঞ্চলাইন-সর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায় সেখানে শুধুই বিদ্রুপের আধিক্য থাকাই স্বাভাবিক। অহেতুক বিদ্রুপ মানে কোথাও অন্যকে ছোট করার মানসিকতা আর সেটা সমর্থনযোগ্য নয়। ছোট শহরের রুচিবোধ এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আচরণকে নকল করার সহজ পথ বেছে নিয়ে উপহাসের ছলে মিমিক্রি করা হাসির আড়ালে অপমানবোধ জাগিয়ে তোলে মারাত্মকভাবে। মৃতদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে তামাশা করা, বিশেষভাবে সক্ষম মানুষ সেজে এসে হাসানোর চেষ্টা, অশালীনভাবে নারীদের ছোট করে বা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার ‘জোকস’ অথবা লিঙ্গরাজনীতিদুষ্ট কনটেন্ট বা কোনওভাবে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনজনিত ট্রমার শিকার মানুষকে নিয়ে কৌতুক কখনোই সুস্থতার পরিচায়ক হতে পারে না। সত্যিকারের কমেডিয়ান ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে হাতিয়ার করে সমাজের সমালোচনা করেন, সেই হাতিয়ার অনর্থক রক্তক্ষরণে ব্যবহার করেন না। আসলে কতটা কৌতুক নিছক মজা আর কতটাই বা আঘাতের আয়ুধ— তার পার্থক্য করাটা খুব জরুরি। সীমারেখাটিও অত্যন্ত সূক্ষ্ম বলেই মাঝে মাঝে অতি নিরীহ হাস্যরস অত সরল আর থাকে না। দু’পক্ষেই গুলিয়ে যায় অধিকার আর দায়িত্বের সংজ্ঞা। পাঠকের মনে পড়বে, একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বাংলা কমেডি শো-এ একজন গভীর সংবেদনশীল মানুষের অন্যরকম লিঙ্গপরিচয়, কথা বলার ধরন, পোশাক ইত্যাদি নিয়ে দিনের পর দিন প্রকাশ্যে কৌতুকের ছদ্মবেশে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-উপহাস চলত প্রতিদিন। সেই অপমান তাঁর প্রাপ্য ছিল না। তাঁকে হাসির খোরাক বানিয়ে তুলে বিনোদনের অধিকার কি সত্যি ছিল কারও? ভারতীয় আইন ব্যবস্থায় অন্তত তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে এইপ্রকার অপরাধের।
কিন্তু এই-ই শেষকথা নয় মোটেই। শুরুর ওই পাগলাটে মানুষটির কাছেই ফিরি। সাধারণ পৃথিবীর অতি তুচ্ছ অসংগতির মোড়কে গভীর হাসি খুঁজে নিয়ে রাজকীয় অসুখ সারানোর ক্ষমতা রাখা হাসিওয়ালারা আছেন আজও। উচ্চবিত্ত, সুবিধাপ্রাপ্ত বা ক্ষমতাশালীর অসংগতি তুলে আনা বা বড় শহরের তথাকথিত শিক্ষিত উচ্চ বা মধ্যবিত্ত সমাজের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়া অসংখ্য শো এখনও হয়ে চলেছে নানা প্ল্যাটফর্মে। সেগুলি ভাবায় আমাদের, হাসায়, হাসির চোটে চোখে জল এনে দেয়। বুদ্ধিদীপ্ত অসংখ্য কনটেন্টরূপে নতুনভাবে সমসময়কে চিনিয়ে দেওয়ার এই সেফটি ভালভটুকু থাকুক। সেখান থেকে কুড়িয়েই না হয় কিছু হাসি বাঁচিয়ে রাখুন নিজের ভিতরে। নিজেকে নিয়ে হাসুন সবার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তারপর আয়নাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সহনাগরিকদের মুখের ওপর ফেলুন, দেখবেন হাসি বড় সংক্রামক আসলে।
(লেখক শিক্ষক। জলপাইগুড়ি বাসিন্দা।)

