রাজবাড়ির মেলা

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


রাজা ঘোষ

অঝোরে বৃষ্টি পড়ত সারারাত সেসময় শ্রাবণের শেষ দিনগুলিতে, মেঘে আর আকাশে মাখামাখি, বাবার হাড় জিরজিরে হারকিউলিস সাইকেল, যা বাবার আগে ঠাকুরদা আর পরে আমিও চেপে পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষা করেছি সেই শব্দকল্পদ্রুম বাহনটির সামনের রডে বসে স্টেশন বাজার ফেরত দুটো ছোট মনসা মূর্তি নিয়ে ফিরতাম, একটাতে কাঠির মাথায় বেশ কটা সাপ ফণা তুলে, আর আরেকটা এক ছাঁচে ছোট মতো আরেকটা মূর্তি। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ঝোলাতে থাকত কলা আর তাল, সঙ্গে আরও অনেক ফল, আটা, গুড় ইত্যাদি।

তিস্তার বাঁধের ধারে বাড়ি, বর্ষা এলেই নানা প্রজাতির, ছোট-বড় তাঁরা উঠোনে চলে আসতেন জল থেকে, কেউ কেউ ঘরে ঢুকে পড়েছে এরকম ঘটনাও নেহাত কম না। তাই ভক্তি আর তা ছাপিয়ে ভয় মিলিয়ে মনসাপুজোটা হত বেশ ঘটা করেই।

আর হত কলার বড়া আর তালের বড়া। ব্রতকথা পড়ার সময় বাড়ির ও পাড়ার নানা বয়সি মেয়েরা জড়ো হত। সঙ্গে লেডিজ কম্পার্টমেন্টে অনধিকার প্রবেশের অস্বস্তি নিয়ে আমরা বেশ কয়েকজন ছেলে বন্ধুও ক্লাস সিক্স-সেভেন-এইট অবধি স্কুল কামাই করে ওই দিনটাতে বসে থাকতাম ওখানেই।

সবার সঙ্গে দুলে দুলে একমনে ব্রতের সুরে সরল পেন্ডুলামের মতো আমরাও অক্সিলেট করতাম বা দুলতাম। আর শুনতাম চাঁদ সওদাগর, বেহুলা-লক্ষিন্দর, তাদের লোহার ঘর, তাতে একটা ছিদ্র, কালনাগিনী, কলার ভেলায় বেহুলার সমুদ্রযাত্রা আরও কত কী। এসব শুনে শুনে আমার এক বন্ধু পরীক্ষার উত্তরপত্রে বিখ্যাত সমুদ্রযাত্রীর নাম কলম্বাস ভুলে বেহুলা আর জাহাজের নাম সান্তা মারিয়ার জায়গায় সান্তা ভেলা লিখে এক নাস্তিক মাস্টারের কর্ণাকর্ষণের বেদনাদায়ক শাস্তি পেয়েছিল। শহরে উদ্বাস্তু মানুষের মাথা গোঁজার আশ্রয় ভাটিয়া বিল্ডিং থেকে ‘অঞ্জনার মা’ বলে নাকে কপালে রসকলি কাটা, পূর্ব পাকিস্তান থেকে রিফিউজি হয়ে আসা এক বোষ্টমি আসত খঞ্জনী হাতে, সে একটাই গান গাইত প্রতিবার ওই দিনে, ‘ঘুমায়ো না আর বেহুলা জাইগ্যা দ্যাখো রে, কাল রাতে কালনাগিনী দংশায় লক্ষিন্দরে…।’

তবে আমি ও আমার বন্ধুরা ওই পেন্ডুলামের দুলুনির কক্ষপথের বিস্তার বা অ্যামপ্লিচিউডটা বাড়িয়ে যতটা সম্ভব সামনে ঝুঁকে আপেক্ষিকভাবে ভক্তি গদগদ চিত্তে চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে এক বুক বিশ্বাস ভরা নিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সামনে রাখা কলার বড়া আর তালের বড়ার গন্ধ নেওয়ার যে আনন্দ পেতাম তার তুলনা এ জীবনে মেলা ভার।

আমি হাতে-পায়ে বাড়ির ভেতর খুব একটা বাল্মীকি কখনই ছিলাম না, বরং আস্ত রত্নাকরই ছিলাম, পায়ের কাছে যা পেতাম তাতেই ফুটবল ভেবে নিয়ে লাথি কষাতাম। মা-বাবার বিয়েতে মায়ের বাবার উপহার দেওয়া বাড়ির কাঁচের একমাত্র আলমারিটি আমার বারংবার বর্গী হানার ক্ষতচিহ্ন বহন করে আরশি বিবর্জিত হয়ে খবরের কাগজ ঢাকা খোপ সহ শ্রীহীন হয়েই থাকত। প্রথম প্রথম সারাই করে কাচ লাগালেও আমার ইন্ডোর ফুটবলের অধ্যবসায়ে কোনও বিচ্যুতি না দেখে কালে কালে বাড়ির লোক কাচ লাগানোর কাঁচা কাজে ইতি টেনেছিলেন।

সে আমিও যে ওইদিন সিক্ত মার্জারের ন্যায় ঘণ্টা দুই ব্রতের আসরে শান্ত হয়ে বসে ব্রতশীলাদের সরল দোলকের দুলুনিতে শামিল হতাম তা ওই কলা ও তালের বড়া নামক অমৃতের টানে। মা এমন দিনে ফিফা হয়ে কড়া ম্যাচ ব্যানের নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন, ‘শান্ত থাকবি নইলে বড়া পাবি না।’ বেচারা আলমারিটি এই মার্জারসুলভ সুশীলতায় সাময়িক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলত, আর পুজো চলত নিরুপদ্রবে।

অবশেষে পুজোর পর বড়া ও প্রসাদ খেয়ে অনাবিল প্রসন্ন বদনে আমরা পুজোর পুরোহিতের পিছু নিতাম। তিনি ছিলেন আমার বাবার অফিসের এক সহকর্মী, আমরা ডাকতাম শম্ভু কাকু বলে। নানা অনুনয়-বিনয় করে সেই পুরোহিত-কাকুর ঝোলায় নানা বাড়ি থেকে পাওয়া দক্ষিণার দুই-এক টাকার কয়েনগুলি থেকে অন্তত একটি-দুটি কয়েন আমরা আদায় করেই ছাড়তাম।

আমি পরবর্তীতে আমার জীবনে নানা কঠিন কাজ করেছি বা হতে দেখেছি, যেমন বৌয়ের সঙ্গে পুজোর ভিড়ে রেডিমেড কাপড়ের দোকানে শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ ম্যাচিং করিয়ে দিগ্বিজয়ী হাসিমুখের স্বামীদের দেখেছি এবং তার ওই সাফল্য কোন প্রকাশনীর বই পড়ে প্রায় সেরকম প্রশ্নও করেছি তাদের, আমি শুধু হোমগার্ডের ভরসায় আপাত অসম্ভব বিবাদহীন এবং নিয়ম মেনে পঞ্চায়েত ভোট দেখেছি, র‌্যাশন দোকানে সৎ দোকানির সুনাম করা প্রসন্নচিত্ত ক্রেতা দেখেছি, বন্যার শিবিরে একসঙ্গে চিড়া গুড় খেতে খেতে খোশগল্প জুড়ে দেওয়া সরকারি কর্মী আর বানভাসি মানুষ দেখেছি, নানা গুরুতর পরিস্থিতি রাতের পর রাত জেগে সামলানো ডাক্তার-পুলিশ-বিডিও এবং তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা মানুষজন দেখেছি, তবে সেসবের চেয়েও এলাকায় উদারতার সামান্যতম বদনামও না থাকা ওই পুরোহিত-কাকুর দক্ষিণার থেকে ওনার ভাষায় ‘জিজিয়া’ আদায় করাটাই এযাবৎ সব থেকে কঠিন কাজ বলে আমার মনে হয়েছে।

তবে এই মহাপাপের জন্য পাঠক আমাকে আওরঙ্গজেব ঠাওর করার আগে আমার উদ্দেশ্যটা একবার শুনে নেওয়া উচিত। সেই বিকেলেই যে যেতেই হবে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির মেলায়, যা তখন চলত আধা মাসেরও বেশি, কিন্তু প্রথম দিন যাওয়ার মজাই আলাদা।

ফাইভ অবধি বাবার সঙ্গেই যেতাম তাই ‘নো প্রবলেম’। সিক্স থেকে গুটি গুটি দুই-এক বন্ধু মিলে যাওয়া শুরু, তাই বাধ্য হয়ে এই স্পনসর বা পৃষ্ঠপোষক খোঁজা। মেলায় যাওয়ার অনুদান অফিসিয়ালি আসত মূলত মায়ের আঁচলে বাঁধা খুঁট থেকে চার আনা, আধুলি বা বহু বার ভাঁজ করে প্রায় ডাকটিকিটের সাইজ করে ফেলা এক কি দুই টাকার নোটে, আর আন-অফিসিয়ালি আসত কৌশলগত প্রক্রিয়ায় পুরোহিত-কাকুর ওপর আবদারের মাধ্যমে। বদলে পাড়ার-বেপাড়ার বিভিন্ন যজমানের বাড়ি ঘুরে ঘুরে সেখান থেকে প্রাপ্য ওনার ভুজ্জি বা চাল, আলু, ফল, কাঁচাকলা এসব ওনার প্রতিনিধি হয়ে সংগ্রহ করে ওনার বাড়িতে পৌঁছে দিতাম আমরা। মিথোজীবী বা সিম্বায়োটিক সম্পর্কের আদর্শ উদাহরণ আরকি।

রাজবাড়ির মনসাপুজোর মেলার আকর্ষণই তখন আলাদা, একে তো তার কলেবর কত বড় ছিল তা এখন কল্পনা করাই বৃথা, তার ওপর চলতও অনেক বেশি দিন ধরে। কাদা পায়ে মেলা ঘোরা ছিল ওই মেলার আসল আকর্ষণ, সে কাদার তুলনা একমাত্র ভূগোলে পড়া নিরক্ষীয় অঞ্চলের জলবনের সঙ্গেই হতে পারত। বেশ কয়েকবার কারও না কারও মেলায় পদস্খলন না হলেও পাদুকা-স্খলন হয়ে পায়ের হাওয়াই চটির একটা ওই কাদাতেই থেকে গেছে আর ভিড়ের চাপে তার মায়া ত্যাগ করে এগিয়ে যেতে হয়েছে, এ আমাদের অনেকের সাথেই অনেকবারই হয়েছে।

আমাদের জীবনে তখন ‘লাইভ’ আমোদের মূল জোগান ছিল এই মেলাগুলি, নাগরদোলা, বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানো, বারবার আর এক চামচ চাটনি চেয়ে বম্বে চাট খাওয়া, ফুচকাওয়ালার গোনা ঘেঁটে দিয়ে দু-একটা বেশি ফুচকা আদায় করা, লাঠিতে ওঠা-নামা করা বাঁদর কেনা, গলায় স্প্রিং দেওয়া ঘাড় নাড়ানো সাহেব পুতুল বা বুড়ো-বুড়ি, টমটম গাড়ি, চিনির বানানো হাতি-ঘোড়া মিষ্টি কেনা, বেতের রিং ছুড়ে মগ-বাটি-গ্লাস জেতার খেলা, এক টাকার প্লাস্টিকের ক্যামেরা কিনে ক্লিক করে করে তাজমহল-লালকেল্লা বা ধর্মেন্দ্র-হেমামালিনীর ছবি দেখা বা একদম শেষে ঝর্ণায় স্নানরতা লিরিল সুন্দরীর ছবি দেখা, মাটির ঘট কেনা আর ফেরার সময় জিলিপি খেতে খেতে বাড়ি ফেরা, কখনও এক পায়ে চটি পরেই!!! রাজবাড়ির মেলায় চটি হারানোর দুঃখের পাশে এইসব প্রাপ্তি শুধু আনন্দেরই না, ওই মেলায় যাওয়া আর মজা করা, কেনাকাটা করা ছিল আমাদের বড় হয়ে ওঠার একটা অনিবার্য প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পরের দিকে স্কুল থেকে কলেজে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে পাদুকা-স্খলনের ঘটনা কমে আসতে থাকে, পদস্খলনের পৌনঃপুনিকতা বাড়তে থাকে, বাল্যকালের নির্মল আনন্দ থেকে কৈশোরের উৎসাহ হয়ে যৌবনের উড়ে উড়ে বেড়ানো। যে বন্ধু সারা জীবন ফুটো পকেট দেখিয়ে বন্ধুদের ফাঁকি দিল, সেও ওই মেলায় কলেজের নতুন বান্ধবীর পেছনে টিউশনের মাস্টারের গুরুদক্ষিণা ঝেড়ে দেওয়া কড়কড়ে একশ টাকা খরচ করছে, এ দৃশ্যও দেখেছি এ মেলাতেই। আমার এই প্রৌঢ়ত্বে আসতে আসতে নানা সময়ের নানা কুশীলব ও নানা কাণ্ডের মাঝে রাজবাড়ির মেলা থেকে গিয়েছে অটল, অবিচল, তার নিজের শরীরেও কালের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে অনেক, পরিসর ছোট হয়েছে, কমেছে কলেবরও, কিন্তু আজও তার উপস্থিতি শহরের বড় হওয়াতে আর বেড়ে ওঠাতে রয়ে গেছে অম্লান অমলিন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *