রংতুলিতেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


দেশভাগের ক্ষত, জীবনের অভিজ্ঞতা আর শিল্পচর্চায় গড়ে উঠেছিল যোগেন চৌধুরীর স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তা।

মৈনাক ভট্টাচার্য

নিভৃত আলাপচারিতায় যোগেন চৌধুরী বলতেন, তাঁদের আসল পদবি ছিল মিশ্র। কনৌজ থেকে তাঁর পরিবার ফরিদপুরে এসে চক্রবর্তী পদবি গ্রহণ করে। পরে জমিজমার সূত্রে যুক্ত হয় চৌধুরী উপাধি। তাঁদের প্রায় আড়াই হাজার বিঘে জমিজমা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করতেন। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। সেই জমিদারি ছেড়ে আট-নয় বছর বয়সেই তাঁকে উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়। মা ভালো আলপনা আঁকতেন। সেখান থেকেই আঁকার প্রতি আগ্রহ। পদবি বদলের মতোই বারবার ভাগ্য বদলেছে তাঁর। কলকাতায় চলে এলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বুকের কোথাও লালন করেছেন দেশভাগের ক্ষত। পরিচিত আলাপচারিতায় সেই ক্ষত থেকেই এঁকে দিতেন গ্রামের কেন্দ্রে থাকা মস্ত দিঘি আর দিঘি লাগোয়া সিমেন্টের ঘাট। জাতশিল্পীরা এমনই হন।

তাঁর শিল্পশিক্ষার হাতেখড়ি কলকাতাতেই। গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে পড়াশোনা। তার পরে হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন কাজ। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে যান। রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। পরবর্তীকালে মাদ্রাজেও টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। শিল্পীর জীবন ও যাপনের সঙ্গে তাঁর শিল্পের যোগ ছিল গভীর। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বারবার খুঁজে নিয়েছেন ছবির উপাদান। প্যারিসের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অভিজ্ঞতাও তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

যোগেন চৌধুরীর শিল্পকর্মে উদ্ভিদ, স্থিরচিত্র ও প্রাণী সহ বিভিন্ন বিষয় প্রাধান্য পেলেও তাঁর হাড়-মজ্জাহীন বলে মনে হয় এমন মানব অবয়বের জন্যই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। রেখা ও ক্রস হ্যাচিংয়ের দক্ষ ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছেন বিকৃত, মোচড়ানো মানবদেহের স্বতন্ত্র রূপ। সেই অবয়বের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে সমাজের অন্তর্নিহিত অবক্ষয়, মানুষের দুর্বলতা এবং জীবনের জটিলতা। তাঁর এই ফর্মই তাঁকে ছবির জগতে আলাদা করে চিনিয়েছে। এই ফর্মের উদ্ভাবনের পিছনে রয়েছে প্যারিস পর্বে আধুনিক শিল্প আন্দোলনের নিজস্ব অনুভব। তাঁর ছবির কিছু বৈশিষ্ট্য মনে করিয়ে দেয় চিত্রশিল্পী পল ক্লি এবং অঁরি মাতিসের শিল্পভাষার কথা। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে রূপ দিয়েই তিনি নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়।

তাঁর শিল্পকর্মে বারবার ফিরে এসেছে নারী। নারী সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেবল যৌনতাকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ ও তার কার্যকলাপের পাশাপাশি লিঙ্গসম্পর্কিত নানা বিষয়ও তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে। শহুরে জীবনের বিচ্ছিন্নতা, ক্ষমতা ও অসহায়ত্বের দ্বন্দ্ব এবং মানবসম্পর্কের জটিলতা তাঁর শিল্পের অন্যতম বিষয়। তাঁর তেলরঙের ছবিতেও অদ্ভুতভাবে দেখা যায় ড্রাই ব্রাশ পদ্ধতির ব্যবহার। এই প্রয়োগ ছবির ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে চরিত্রগুলির রুক্ষ ও ক্ষয়িষ্ণু রূপকে আরও ফুটিয়ে তোলে। রঙের সঙ্গে পৃষ্ঠতলের মিথস্ক্রিয়ায় তাঁর শিল্পকর্মে তৈরি হয় স্বতঃস্ফূর্ত ও গীতিময় এক গুণ। বাস্তবের চেয়ে আবেগ সেখানে বেশি গুরুত্ব পায়। তাই তাঁর ছবি একইসঙ্গে উদ্দীপক ও চিন্তার উদ্রেককারী।

শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। ১৯৬৬ সালে প্যারিসে প্রি লা ফ্রঁস দ্য লা জ্যুন পেইন্টুর পুরস্কার পান। ১৯৬৭ সালে ললিত কলা আকাদেমির জাতীয় পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরস্কারও তাঁর সম্মানের তালিকায় রয়েছে। ২০০১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকারের কালিদাস সম্মান এবং ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্গবিভূষণ পান। কিন্তু পুরস্কার নয়, ছবি আঁকার ভেতর থেকেই তিনি সব সময় খুঁজে নিতেন তাঁর আনন্দ, তাঁর ভালো লাগা। তাই রাজ্যসভার সদস্য বা রাজনৈতিক কর্মী পরিচয় কখনও তাঁর একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠেনি। নিন্দুকের অনেক কথা থাকলেও বাঙালি মননে তিনি শুধু জমিদারপুত্র, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা রাজ্যসভার সদস্য নন। দিনের শেষে যোগেন চৌধুরী আদ্যোপান্ত একজন শিল্পীই।

(লেখক ভাস্কর ও বাস্তুকার। শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *