ঝিনুকে মুক্তো। বঙ্গ অর্থনীতিতে সেই মুক্তো ঝরানোর সঙ্গী বাঙালির পাতে অধুনা ব্রাত্য গেঁড়ি-গুগলিও। এসবের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করছে জ্যান্ত দশরথ। যাকে পাতি বাংলায় কাঁকড়া বলা হয়। ভিয়েতনাম থেকে ব্যাঙ্কক, চিন, ইন্দোনেশিয়ার বাজার তো বটেই, ইউরোপের দেশগুলিও এর ভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে খুলে গিয়েছে রপ্তানির বড় বাজার। যা ধরতে তৎপর এই বঙ্গের ব্যবয়াসীরা। সেই ব্যবসার কারণেই এইসবের চাষও বেড়ে চলেছে। তবে কাঁকড়ার রপ্তানির বড় বাজার আমেরিকা বাড়তি শুল্ক চাপানোয় সেখানে বড় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন রপ্তানিকারকরা। কেন্দ্রীয় সংস্থা মেরিন প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলাপমেন্ট অথরিটি সূত্রে খবর, পারাদ্বীপ এবং দক্ষিণ ভারতও কাঁকড়া রপ্তানি করে বটে, গেঁড়ি, গুগলিতে বঙ্গকে টেক্কা দিতে পারছে না কেউই। আপাতত কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে এইসব রপ্তানিতে ব্যস্ত এখানকার জনা চারেক রপ্তানিকারক।
পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল এলাকার নন্দীগ্রাম, খেজুরি, কাঁথি, রামনগর, কোলাঘাট, হলদিয়া প্রভৃতি এলাকায় বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে। মূলত দুই ধরনের কাঁকড়া চাষ হয়ে থাকে। একটি কাদা কাঁকড়া, যা কর্দমাক্ত, নোনা মাটিতে চাষ হয়। অপরটি জল কাঁকড়া। উপকূলীয় এলাকায় নোনা জলে খুব দ্রুত এই কাঁকড়া বেড়ে ওঠে। দেশের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি উৎপাদিত কাঁকড়া আমেরিকা, ব্যাঙ্কক, সিঙ্গাপুর, চিন-সহ বেশ কিছু দেশের বাজারে রপ্তানি হয়। তবে আমেরিকা হঠাৎ করে ভারতের উপরে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক চাপানোয় চিন্তা বাড়িয়েছে কাঁকড়া চাষিদের। চিন্তায় রয়েছেন রপ্তানিকারকরাও। কাঁকড়া চাষিরা জানাচ্ছেন, রাজ্য মৎস্য দপ্তরের সহযোগিতায় উন্নত উপায়ে চাষ করে অল্প দিনের মধ্যেই ভালো কাঁকড়া উৎপন্ন হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
সেই কাঁকড়া রপ্তানি করে লাভের মুখ দেখছেন চাষিরা। কিন্তু এখন রপ্তানি শুদ্ধ তাঁদের মাথাব্যাথার কারণ। রপ্তানিকারক, উত্তর ২৪ পরগনার মসলন্দপুরের বাসিন্দা অমিতকুমার মিত্র জানিয়েছেন, “ঝিনুক কেনে ভিয়েতনাম ও ব্যাঙ্কক। প্রতিদিন কম করে ১৫ টন রপ্তানি হয় কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে। আর শামুক যায় প্রতিদিন প্রায় তিন টন। যা উপকূলবকী মোহনা অথবা মিস্টি জলের পুকুরেও হয়। সবই পাঠাতে হয় জ্যান্ত।”
কাঁকড়া অবশ্য জ্যান্ত পাঠাতে হয়। রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, “এক একটি বাক্সে ১৫ কেজি ভরা হয়। সেই সব বাক্সে ফুটো রাখা হয়, যাতে কাঁকড়া অক্সিজেন নিতে পারে। তবে এর মধ্যেও মারা যায় বেশ কিছু। সেগুলি সহজে বিক্রি করা যায় না বিদেশে।” কাঁকড়া রপ্তানির আগে আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়ম মেনে বেশ কিছু টেস্ট বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। গায়ে সাদা ছোপ বা দাগ থাকলে তা বাতিল হয়ে যায়। চিন সবরকম কাঁকড়া নিলেও তাইওয়ান কেনে সাধারনত ডিমওয়ালা বা মাদী কাঁকড়া। চিনের বাজার বুম হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। ওইসময় সেখানে নতুনবছরের প্রস্তুতি থেকে মেতে ওঠা। তাই চাহিদা চরমে ওঠে। তবে ছোট কাঁকড়া নয়, কম করে আড়াইশো গ্রাম থেকে দু’কেজি পর্যন্ত ওজনের চাহিদাই বেশি। আন্দামান বড় কাঁকড়ার মূল জোগানদার। দেড় থেকে দু’হাজার টাকা কেজিতে সেগুলি কেনেন এখানকার রপ্তানিকারকরা।
তবে গেড়ি গুগলির জোগান দিয়ে যে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি নয়া দিশা দেখছে তা মেনে নিয়েছেন মেরিন প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট ডেভেলাপমেন্ট অথরিটির এক কর্তা। সি ফুড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের এক আধিকারিক পার্থ ঘটকের দাবি, “রপ্তানি বেড়েছে। তবে পরিকাঠামো আরও ভালো হওয়া দরকার। তাতে লক্ষ্মীর ঝাঁপি ভরবে রাজ্যেরই।” মৎস্যদপ্তরের এক আধিকারিক সুমন সাহু বলেন, “কাঁকড়া চাষ হচ্ছে খুব ভালোভাবেই। বহু চাষি যুক্ত। রপ্তানিতেও তা কাজে আসছে, সেটাই চাষিদের কাছে বড় কথা এবং আমাদের সাফল্যও বটে।”
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
