আশিস ঘোষ
অতঃপর এখানে প্রেম নিষিদ্ধ। ভালোবেসে বিয়ে চলবে না। না মানলে সেই পরিবারের সঙ্গে সমাজের কেউ যোগাযোগ রাখতে পারবে না। দোকানবাজার, পুরুত থেকে ধোপা-নাপিত সব বন্ধ। তাদের জমিতে কেউ চাষ করতে পারবে না। পুরোদস্তুর সামাজিক বয়কট। আশ্রয় দিলে সমাজচ্যুত করা হবে সেই পরিবারকে।
ঘটনাটি সেকালের নয়। সবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের। মধ্যপ্রদেশের রতলাম জেলার পেঞ্চেয়া গ্রামের পঞ্চায়েত ফতোয়া এটা। গ্রাম থেকে পরপর আটজন পালিয়ে বিয়ে করায় উদ্বিগ্ন হয়ে পঞ্চায়েত এমন নির্দেশ দিয়েছে। সমাজপতিদের মনে হয়েছে, সমাজ উচ্ছন্নে গিয়েছে। তাই প্রেম নিষিদ্ধ, প্রেমজনিত বিয়েতে মানা। গ্রামের দোরগোড়ায় ধুলো পায়ে ফেরত যেতে হবে প্রেমকে। ভিতরে ঢোকা চলবে না।
এমনিতে ‘লাভ জেহাদ’-এর নামে খাপ পঞ্চায়েত গোবলয়ে জলভাত। ভিনধর্মে প্রেম হলে পিটিয়ে মেরে ধর্ম উদ্ধার করার খবর মাঝেমধ্যে শিরোনামে আসে। হিন্দু মেয়ে আর মুসলিম ছেলের প্রেম হলে তো আর রক্ষে নেই। হিন্দু অবলাদের ফুসলিয়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার আখ্যান বেশ কিছুদিন ধরে চলছে। এতে নাকি দেশের জনসংখ্যার কাঠামোটা বদলে যাচ্ছে। সনাতন ধর্মরক্ষার ব্রতে দীক্ষিত স্বয়ংসেবকরা তাই আদাজল খেয়ে লেগেছেন প্রেমের সনাতনী শুদ্ধতা নিয়ে। কোনও গড়বড় চলবে না। লাভ জেহাদ দেখলেই পিটিয়ে মারো।
রতলামে এই ঘটনার পর পুলিশ খানিক দৌড়ঝাঁপ করছে। জনাছয়েককে ধরে কড়কে দিয়েছে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খাতা দেখে একজন ধর্মরক্ষক বলে যাচ্ছেন, প্রেমবিবাহে জড়িত কোন কোন পরিবারের হুঁকো-নাপিত সম্পূর্ণ বন্ধ করা হচ্ছে। ঘোষণা করা হচ্ছে, গ্রামের কেউ ওইসব পরিবারের থেকে জিনিসপত্র, দুধ কিনবে না। তাদের চাষের জমিতে লাঙল পড়বে না। কেউ যদি তাদের আশ্রয় দেয়, তবে তাদেরও বয়কট করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে বের করে দেওয়া হবে সমাজ থেকে।
গত বছরের জুনে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল পেঞ্চেয়া গ্রামের একজোড়া তরুণ-তরুণী। গোড়ায় হইচই হলেও পরে দুজনের পরিবারই তাদের বিয়েটা মেনে নেয়। তা সত্ত্বেও পঞ্চায়েতে ডেকে সবার সামনে তাদের যাচ্ছেতাই গালাগালি করা হয়। যাতে ছেলেমেয়েরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে না করে, সেজন্য তাদের সামলে রাখতে এই নিদান বলে পরে যুক্তি দিয়েছেন গাঁয়ের মাতব্বররা।
এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশের বস্তি, এটা জেলায় চলছে জোরদার লাভ জেহাদ বিরোধী অভিযান। গোদি মিডিয়ায় রোজ নানারকম রোমহর্ষক কাহিনী শোনা যাচ্ছে। যোগী আদিত্যনাথ সভায় সভায় বলে চলেছেন, হিন্দু মেয়েদের ফুসলিয়ে ধর্ম বদলে মুসলিমদের বিয়ে করাটা তিনি মোটেই সহ্য করবেন না। এসব করে দেশের জনবিন্যাস পালটে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
আফগানিস্তানের বাগলান প্রদেশে ২৮ বছরের কাদরিয়া ৩৫ বছরের আশিককে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের পাথর ছুড়ে মেরে ফেলার হুকুম হয়। শেষপর্যন্ত ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁদের পাঁচ বছরের জেল হয়। এমন কত আতিক-বিলকিস, আজিজ-সুকরিয়া, রেহমান-ফৌজিয়ার কিসসা যে রুক্ষ কাবুলি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে!
সদ্য আফগানিস্তানের তালিবান নতুন আইন তৈরি করেছে। তাতে নাগরিকদের চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। একেবারে নীচুতলায় রাখা হয়েছে মহিলাদের। তাদের উপর নির্যাতন করা হলেও সাজা হবে না। হলেও নামমাত্র। প্রেম সেখানে বারণ। যুগলকে প্রকাশ্যে দেখা গেলে চাবুকের ঘা থেকে শুরু করে সোজা কোতল। প্রেমের কবিতা লেখা নিষেধ।
এমাসে আবার ভোট পড়শি বাংলাদেশে। সেখানকার বড় দল জামায়াতে ইসলামির আমির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দলের আমির পদে কোনও মহিলা কখনও দায়িত্ব পাবেন না। কেননা, তাঁরা ওই পদের যোগ্য নন। আল্লাহ তাঁদের অন্যভাবে গড়েছেন। জামায়াতের প্রার্থীতালিকায় একজনও মহিলা নেই।
ধর্ম আলাদা। ভাষা আলাদা। দেশ আলাদা। সমাজ আলাদা। তবু চরিত্রে কী আশ্চর্য মিল এঁদের। মেয়েদের অসম্মানে কুলপতিরা হরিহরাত্মা। বছর নয়েক আগে কেরলে ভিন্নধর্মে বিয়ে নিয়ে ঝামেলা আদালতে গড়িয়েছিল। কেরল হাইকোর্ট সেই বিয়ে নাকচ করে দেয়। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়কে খারিজ করে জানিয়ে দেয়, সব ভিনধর্মের বিয়ে লাভ জেহাদ বলে দাগিয়ে দেওয়া চলবে না।
হাদিয়া নামের ২৪ বছরের এক হিন্দু মেয়ে শাফিন জাহান নামে এক মুসলিম যুবককে বিয়ে করে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, নিজের পছন্দমতো সঙ্গী বেছে নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে পরিণতবয়স্ক হাদিয়ার। এনআইএ-কে দিয়ে তদন্ত করিয়ে লাভ জেহাদের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ইচ্ছের বিরুদ্ধে মহিলাদের ঘর ওয়াপসির বহু দৃষ্টান্ত মিলেছে অন্যত্র। সর্বোচ্চ আদালতের স্পষ্ট রায়, এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা মানতে হবে। মেয়েদের সম্মতি একমাত্র বিবেচ্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
শেষ করা যাক তালিবান মুলুকের ফার্সি কবি জালালুদ্দিন রুমির দুটো লাইন দিয়ে- ‘সবকিছুর পরও যে থেকে যায় বাকি, তাকে ভালোবাসো/ হে দৃষ্টিমান, পান করো তার প্রেমের পেয়ালা থেকে।’ রুমির কবিতা পড়তে ভারী বয়েই গিয়েছে তালিবানি মোল্লাদের।
