যেচে আলাপ যেন উপদ্রব, বিশ্বজুড়ে ভয়ংকরভাবে বাড়ছে একাকীত্ব

বৈশিষ্ট্যযুক্ত/FEATURED
Spread the love


‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র ২০২৫ সালের সামাজিক সংযোগ বিষয়ক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানটি বেশ অস্বস্তিকর। পৃথিবীর প্রায় ৬ জন মানুষের একজন একাকিত্ব অনুভব করে– মোট প্রায় ১৬ শতাংশ। কিশোরদের মধ্যে এই হার প্রায় ২০.৯ শতাংশ, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে প্রায় ১৭.৪ শতাংশ, ৩০ থেকে ৫৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ১৫.১ শতাংশ, এবং ৬০ বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে ১১.৮ শতাংশ। মানুষের সঙ্গে আলাপ করা এখন যেন উপদ্রব! লিখছেন, দীপ্র ভট্টাচার্য

লিফ্‌টের দরজা বন্ধ হয়। ভিতরে চারজন মানুষ। চারজনের হাতেই মুঠোফোন। একজন পর্দায় আঙুল চালাচ্ছে, একজন কানে শ্রবণযন্ত্র গুঁজে পৃথিবীর সঙ্গে সাময়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তৃতীয়জন এমন গভীর মনোযোগে একটি ছোট্ট ভিডিও দেখছে যেন ভিডিওটির শেষ না-দেখা পর্যন্ত সভ্যতার পতন ঠেকানো সম্ভব নয়! চতুর্থজনেরও চোখ নিচু। লিফ্‌ট আটতলায় পৌঁছয়। দরজা খোলে। চারজন চার দিকে চলে যায়। আটতলা ওঠার এই এক মিনিটে চারজন মানুষের মধ্যে কোনও কথাই হয় না।

আরও পড়ুন:

আমাদের হাতে মুঠোফোন। মুঠোফোনে অসংখ্য মানুষ। দূরের মানুষ, কাছের মানুষ। মৃত মানুষ, বিখ্যাত মানুষ, অচেনা মানুষ। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, এত মানুষের মধ্যে থেকেও পাশের মানুষটির সঙ্গে আমাদের কথা ক্রমশ কমছে! এবং এই ‘কথা না বলা’-কে আমরা ধীরে ধীরে আধুনিকতার স্বাভাবিক লক্ষণ বলে মেনেও নিচ্ছি! এখানেই বিপদটি একটু গভীর। কারণ, ছোট কথা আসলে ছোট নয়। ‘কেমন আছেন?’ প্রশ্নটির উত্তর আমরা প্রায় কেউই সত্যি সত্যি জানতে চাই না। উত্তরদাতাও সাধারণত জানে যে, প্রশ্নটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনুসন্ধান নয়। সে বলে, ‘ভাল আছি।’ প্রশ্নকারী বলে, ‘ভাল।’ কথোপকথন শেষ। কিন্তু এই সামান্য বিনিময়ের ভিতরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাজ ঘটে যায়, দু’জন মানুষ একে-অপরের অস্তিত্ব স্বীকার করে।

মানুষের সামাজিক জীবন অনেক সময়েই এই সামান্য স্বীকৃতিগুলির উপরে দাঁড়িয়ে থাকে। চায়ের দোকানের সেই দোকানদার, যে জানে আপনি চায়ে চিনি কম খান; পাড়ার সেই রিকশাচালক, যে জানে কোন বাড়িতে বৃদ্ধ মানুষটি থাকে; বাসের সেই কন্ডাক্টর, যে নিয়মিত যাত্রীকে মুখ দেখে চিনে ফেলে– এরা কেউ আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়। কিন্তু এরা আপনার সামাজিক জগতের অংশ। এদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের কোনও আনুষ্ঠানিক নাম নেই, কোনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সম্পর্কের ঘোষণা নেই, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে এই অদৃশ্য পরিচয়গুলিই সমাজের নিরাপত্তার জাল তৈরি করে। সমাজ কেবল পরিবার, বন্ধুত্ব আর আত্মীয়তার যোগফল নয়; সমাজের একটি বিশাল অংশ তৈরি হয় এসব ক্ষীণ, অনানুষ্ঠানিক, প্রায় অদৃশ্য সম্পর্ক দিয়ে। ছোট কথার অভ্যাস হারিয়ে গেলে এই অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে।

আমরা কেমন সমাজে থাকতে চাই? এমন একটি সমাজে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের মানুষের সঙ্গে এক মুহূর্তে যোগাযোগ করা যায়, কিন্তু পাশের মানুষটির চোখের দিকে তাকানো অস্বস্তিকর? এমন একটি সমাজে, যেখানে প্রত্যেকের হাতে হাজার মানুষের খবর, অথচ বিপদের দিনে দরজায় কড়া নাড়ার মতো মানুষ নেই?

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র ২০২৫ সালের সামাজিক সংযোগ-বিষয়ক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানটি তাই বেশ অস্বস্তিকর। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি হিসাব করেছে, পৃথিবীর প্রায় ৬ জন মানুষের একজন একাকিত্ব অনুভব করে– মোট প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ। কিশোরদের মধ্যে এই হার প্রায় ২০.৯ শতাংশ, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে প্রায় ১৭.৪ শতাংশ, ৩০ থেকে ৫৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ১৫.১ শতাংশ, এবং ৬০ বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে ১১.৮ শতাংশ। অর্থাৎ একাকিত্বকে শুধু বৃদ্ধ মানুষের সমস্যা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই; বরং সাম্প্রতিক ডেটা বলছে, তরুণদের মধ্যেই এর হার বেশি। নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে পরিস্থিতি আরও তীব্র– সেখানে প্রায় ২৪.৩ শতাংশ মানুষ একাকিত্ব অনুভব করে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে হার প্রায় ১১ শতাংশ।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ একাকিত্বকে শুধু ‘মনখারাপ’ বলে দেখছে না। তাদের ভাষায়: ‘একাকিত্ব হল মানুষ যে পরিমাণ সামাজিক সম্পর্ক চায় বা প্রয়োজন মনে করে এবং বাস্তবে যতটা সম্পর্ক পায়, তার মধ্যে ব্যবধান থেকে তৈরি হওয়া এক যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি।’ আর ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ হল বাস্তব জীবনে যথেষ্ট সম্পর্ক, ভূমিকা ও পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব। অর্থাৎ কারও ফোনে ৫০০ ‘পরিচিত’ থাকতে পারে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজারখানেক অনুসারী থাকতে পারে, রোজ বহু বার্তা আসতে পারে– তা সত্ত্বেও মানুষটি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। সংখ্যার ভিড় আর সম্পর্কের গভীরতা এক নয়। এই জায়গায় মুঠোফোনকে একমাত্র ‘খলনায়ক’ বানিয়ে ফেললে অবশ্য সুবিধা হয়, কিন্তু সত্যিটা তত সরল নয়। মুঠোফোন দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, যোগাযোগকে সস্তা করেছে, একাকী মানুষকে অনেক সময় সঙ্গ দিয়েছে। সমস্যা যন্ত্রটির অস্তিত্বে নয়, বরং যন্ত্রটি আমাদের আচরণের জায়গা দখল করে নেওয়ায়। আমরা এখন অপেক্ষা করতে পারি না।

বাস আসতে ৫ মিনিট দেরি? ফোন খুলুন। লিফ্‌টে ৩০ সেকেন্ড? ফোন খুলুন। চায়ের দোকানে চা আসতে ২ মিনিট? ফোন খুলুন। বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে? দু’জনেই কিছুক্ষণ পরে নিজের নিজের ফোনে চলে যান। অর্থাৎ অবসর, অপেক্ষা, নীরবতা– যে জায়গাগুলি এক সময় অন্য মানুষের সঙ্গে অনির্ধারিত কথাবার্তার সুযোগ তৈরি করত, সেগুলি এখন মুঠোফোন দখল করেছে। ফলে আমরা শুধু কথা বলার সময় হারাইনি; কথা বলার সুযোগটাকেও হারিয়েছি। আরও ভয়ংকর হল, আমরা ধীরে ধীরে অপরিচিত মানুষকে সম্ভাব্য কথোপকথনের সঙ্গী রূপে না দেখে ‘সম্ভাব্য বিরক্তি’-র কারণ রূপে দেখতে শুরু করেছি। লিফ্‌টে পাশের মানুষটি কথা বললে মনে হয়, ‘কেন কথা বলছে?’ বাসে কেউ মন্তব্য করলে মনে হয়, ‘আমাকে জড়াচ্ছে কেন?’ চায়ের দোকানে কেউ রাজনৈতিক মতামত দিলে মনে হয়, ‘চুপ করে চা খেতে দিচ্ছে না কেন?’ যেন জনসমক্ষে থাকার অর্থই হল প্রত্যেকে নিজের ব্যক্তিগত বদ্বুদের মধ্যে থাকবে এবং অন্যের অস্তিত্বকে যতটা সম্ভব উপেক্ষা করবে।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ একাকিত্বকে শুধু ‘মনখারাপ’ বলে দেখছে না। তাদের ভাষায়: ‘একাকিত্ব হল মানুষ যে পরিমাণ সামাজিক সম্পর্ক চায় বা প্রয়োজন মনে করে এবং বাস্তবে যতটা সম্পর্ক পায়, তার মধ্যে ব্যবধান থেকে তৈরি হওয়া এক যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি।’

২০১৪ সালে নিকোলাস এপলি ও জুলিয়ানা শ্রোয়েডারের গবেষণায়– যাত্রীদের একটি অংশকে যাত্রাপথে ‘অপরিচিত’ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছিল, আর অন্যদের ‘একা’ থাকতে বলা হয়েছিল। যারা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিল, তারা যাত্রার অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে বেশি ‘আনন্দদায়ক’ বলে জানিয়েছিল। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, আগে যখন যাত্রীদের অনুমান করতে বলা হয়েছিল, তারা কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবে, তখন অনেকেই ভেবেছিল অপরিচিতের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে একা থাকাই হয়তো বেশি সুখকর হবে। অর্থাৎ সমস্যা সবসময় কথার প্রতি অনীহা নয়; অনেক সময় আমরা আগেই ধরে নিই যে, অন্য মানুষটি কথা বলতে চাইবে না।

সমাজবিমুখতা কখনও কখনও কোনও ঘোষিত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বহু মানুষের ছোট ছোট পারস্পরিক ভুল অনুমানের ফল। আমি ভাবছি– আপনি কথা বলতে চান না। আপনিও ভাবছেন, আমি কথা বলতে চাই না। ফলে দু’জনেই চুপ। পরের দিন আবার একই ঘটনা। কয়েক মাস পরে দেখা গেল, আমাদের শহরটি মানুষের ভিড়ে ঠাসা, কিন্তু কথাবার্তায় প্রায় ফাঁকা।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরও একটি কঠিন সত্য সামনে এসেছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের প্রভাব কেবল মানসিক সুস্থতার মধ্যে আটকে নেই; এগুলির সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একাকিত্বের সঙ্গে যুক্ত কারণে বছরে আনুমানিক ৮ লক্ষ ৭১ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে– অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি মৃত্যু।

আমাদের শহরগুলিও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই বহুতলে শত-শত মানুষ বাস করে, অথচ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নাম আমরা জানি না। একই অফিসে বছরের পর বছর কাজ করেও সহকর্মীর জীবনের কোনও খবর জানি না।

একটি সমাজ কতটা সুস্থ, তা শুধু তার মাথাপিছু আয়, বহুতলের সংখ্যা, বা ইন্টারনেটের গতি দিয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায়, সেখানে মানুষ অপরিচিতকে কতটা মানুষ বলে গণ্য করে। ট্রেন থেকে কেউ পড়ে গেলে ৫ জন এগিয়ে আসে কি না। পাড়ার বৃদ্ধ মানুষটির কয়েক দিন দরজা না খুললে কেউ খোঁজ নেয় কি না। দোকানদার নিয়মিত ক্রেতাকে চিনতে পারেন কি না। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকেরা একে-অপরকে চেনে কি না। রাস্তায় বিপদে পড়লে আশপাশের মানুষ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে কি না। এগুলি কোনও ‘একক’ বন্ধুত্বের ফল নয়; এগুলি সামাজিক পরিচিতির ফল। হাজার দিনের পুনরাবৃত্তি অনুশীলনের ফলে একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে। যে-পরিবেশে মানুষ একে-অপরকে অদৃশ্য নয় বলে মনে করে।

আমাদের শহরগুলিও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই বহুতলে শত-শত মানুষ বাস করে, অথচ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নাম আমরা জানি না। একই অফিসে বছরের পর বছর কাজ করেও সহকর্মীর জীবনের কোনও খবর জানি না। একই বাসে প্রতিদিন একই মুখ দেখি, কিন্তু মুখের সঙ্গে কোনও পরিচয় তৈরি হয় না। শহর আমাদের কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু সবসময় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেনি। তার উপর মুঠোফোন ‘ব্যক্তিগত পরিসর’-এর দেওয়াল আরও উঁচু করেছে। আগে বাসে ‘একা’ বসে থাকার অর্থ ছিল জানলার বাইরে তাকানো, মানুষের মুখ দেখা, হয়তো অনিচ্ছায় কারও কথা শোনা। এখন ‘একা’ থাকার অর্থ নিজের নির্বাচিত পৃথিবীর মধ্যে ঢুকে যাওয়া। ফলে বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চিত, বিরক্তিকর, অপ্রত্যাশিত মানুষগুলিকে এড়িয়ে আমরা এমন এক পৃথিবী বানিয়েছি– যেখানে যা দেখতে চাই শুধু সেটাই দেখি, যার কথা শুনতে চাই শুধু তার কথাই শুনি। কিন্তু সমাজ তো বাছাই করা মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না। সমাজ তৈরি হয় সেই মানুষটি দিয়েও, যাকে আপনি চেনেন না, পছন্দ করেন না, এমনকী যার সঙ্গে আপনার কোনও মিল নেই। গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ সম্ভবত এখানেই– অন্যের অস্তিত্ব সহ্য করা, তাকে স্বীকার করা, তার সঙ্গে কথা বলতে পারা।

এখন ‘একা’ থাকার অর্থ নিজের নির্বাচিত পৃথিবীর মধ্যে ঢুকে যাওয়া। ফলে বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চিত, বিরক্তিকর, অপ্রত্যাশিত মানুষগুলিকে এড়িয়ে আমরা এমন এক পৃথিবী বানিয়েছি– যেখানে যা দেখতে চাই শুধু সেটাই দেখি, যার কথা শুনতে চাই শুধু তার কথাই শুনি। 

তাই ‘ছোট কথা’ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিছক নস্টালজিয়া দিয়ে দেখলে ভুল হবে। এটা শুধু ‘আমাদের সময়ে মানুষ বেশি ভাল ছিল’ ধরনের বয়স্ক আপশোস নয়। প্রযুক্তি বদলাবে, মানুষের যোগাযোগের ধরনও বদলাবে– স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল, নতুন যোগাযোগ পুরনো সামাজিক দক্ষতাগুলিকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করছে কি না। আমরা দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করতে গিয়ে কাছের অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছি কি না। আমরা তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সম্পর্কের সংকট তৈরি করছি কি না।

এখন সবচেয়ে জরুরি প্রযুক্তিবিরোধী আন্দোলন নয়, বরং সামান্য সামাজিক পুনর্বাসন। লিফ্‌টে উঠলে সবসময় কথা বলতে হবে এমন নয়। বাসে অপরিচিতকে বিরক্ত করাও কোনও মহান মানবিক কর্তব্য নয়। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকার আছে। কিন্তু সবসময় পর্দার আড়ালে চলে যাওয়াটাও যেন আমাদের একমাত্র স্বাভাবিক আচরণ না হয়ে যায়। আমরা কেমন সমাজে থাকতে চাই? এমন একটি সমাজে, যেখানে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের মানুষের সঙ্গে এক মুহূর্তে যোগাযোগ করা যায়, কিন্তু পাশের মানুষটির চোখের দিকে তাকানো অস্বস্তিকর? এমন একটি সমাজে, যেখানে প্রত্যেকের হাতে
হাজার মানুষের খবর, অথচ বিপদের দিনে দরজায় কড়া নাড়ার মতো মানুষ নেই? না কি এমন একটি সমাজে, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, ব্যক্তিগত পরিসর থাকবে, নীরবতার অধিকার থাকবে; তার পাশাপাশি থাকবে সেই পুরনো, আপাতদৃষ্টিতে নিরর্থক অভ্যাসটিও: অপরিচিতকে মানুষ রূপে দেখা এবং মাঝে মাঝে তার সঙ্গে কথা বলা?

ভুললে হবে নাা, সভ্যতা বড় বড় বক্তৃতা, মহৎ আদর্শ বা অসাধারণ আবিষ্কারের উপর যতটা না দঁাড়িয়ে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি দাঁড়িয়ে থাকে ছোট ছোট মানবিক স্বীকৃতির উপর। সমাজ হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত হবে, আরও দ্রুত হবে, আরও সংযুক্ত হবে– শুধু মানুষগুলি একে-অপরের কাছে যেন অচেনা না হয়ে যায়!

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *