যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে এআই

যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে এআই

শিক্ষা
Spread the love


অতনু বিশ্বাস

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সমাজমাধ্যমে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এক ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবিতে দেখা যায়, বোমার আঘাতে নিহত ইরানের স্কুল ছাত্রীদের জন্য সারিবদ্ধভাবে কবর খোঁড়া হচ্ছে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন টুল ‘জেমিনাই’-কে প্রশ্ন করা হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তথ্য সামনে আসে। জেমিনাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি আদতে ২০২৩ সালে তুরস্কে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর গণকবর খোঁড়ার একটি পুরোনো ছবি। তবে জেমিনাইয়ের দেওয়া এই তথ্যটিই বা কতটা নির্ভুল, তা নিয়েও সংশয়ের অবকাশ থেকে যায়। বর্তমান যুগে যুদ্ধের আবহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি এমন অজস্র ছবি বা ভিডিও প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সামরিক আক্রমণ, ধ্বংসলীলা বা মৃতদেহের এই ধরনের ভুয়ো ছবি জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এমনকি, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জীবিত আছেন কি না, সেই তীব্র জল্পনার মধ্যেই তাঁর একটি ভিডিও সামনে আসে। সেখানে তাঁর হাতের ছ’টি আঙুল এবং কফির কাপের অভিকর্ষ-বিরোধী ভারসাম্য দেখে বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন যে, সেটি সম্পূর্ণভাবে এআই দ্বারা নির্মিত একটি ‘ডিপফেক’ ভিডিও।

বাস্তবতা হল, আধুনিক যুদ্ধ কেবল আর রণাঙ্গনে গোলাগুলির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ এখন সমানতালে চলছে ঘরে এবং বাইরে। মানুষের মনে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করা এবং ভাবমূর্তি নির্মাণ বা ভাঙার এই নিরন্তর স্নায়ুযুদ্ধ এখন প্রকৃত যুদ্ধের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে আপন ক্ষমতাবলে এক অপ্রতিরোধ্য জায়গা করে নিয়েছে, সেকথা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে বিষয়টি শুধুমাত্র ভুয়ো খবর বা ছবি তৈরির মধ্যেই আটকে নেই। মানবজীবনের অন্য পাঁচটা ক্ষেত্রের মতোই এআই এখন পুরোদস্তুর ঢুকে পড়েছে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ময়দানেও। আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ থেকে শুরু করে সামরিক স্ট্র্যাটেজি বা রণকৌশল নির্ধারণ, শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু স্থির করা এবং অস্ত্রশস্ত্রের নিখুঁত প্রয়োগ— সব ক্ষেত্রেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবল আধিপত্য। গত ৭ মার্চ প্রখ্যাত মার্কিন পত্রিকা ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক যুগান্তকারী প্রযুক্তির ব্যবহার। নিবন্ধটির ভাষায়, ‘এই মাত্রায় আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি এমন একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।’

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। আন্তর্জাতিক মহল ২০১২ সাল থেকেই আধুনিক যুদ্ধে এআই-এর প্রভাব এবং সম্ভাবনার দিকে কড়া নজর রাখতে শুরু করেছিল। তা সত্ত্বেও, বর্তমান ইরান সংঘাতকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ‘প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এর মূল কারণ হল, এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধনীতির সমস্ত পুরোনো নিয়মকানুন নতুন করে লিখছে। যুদ্ধে দ্রুততম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামরিক অর্থনীতির সমীকরণ বদলে দেওয়া এবং ডেটা সেন্টারের মতো সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে স্থির করার ক্ষেত্রে এআই-এর এই ব্যাপক প্রয়োগ আগে কখনও দেখা যায়নি। এটি এমন এক নতুন যুগের সূচনা করছে, যেখানে আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে মানুষের ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত।

যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তর গবেষণা চলছে। সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধে এআই-এর ব্যবহার বলতে সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে দেখা বিধ্বংসী ঘাতক রোবটের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা কিছুটা আলাদা। বর্তমানে যুদ্ধে এআই-এর সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর ব্যবহার প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও নেপথ্যের কাজগুলিতে বেশি হচ্ছে। অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং শ্রম-নিবিড় কাজ, যেমন— সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, নিখুঁত মিশন পরিকল্পনা এবং রসদ সরবরাহের মতো ক্ষেত্রগুলিতে এআই এমন এক অভাবনীয় গতি এনেছে, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন চ্যাটজিপিটি-র মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল-ভিত্তিক (এলএলএম) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যার সাহায্যে মুহূর্তে হাজার হাজার ছবি প্রক্রিয়াকরণ করে কৌশলগত উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হচ্ছে।

কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ একটি ‘এআই-ফার্স্ট’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী রিয়েল-টাইম টার্গেটিং বা তাৎক্ষণিকভাবে লক্ষ্যবস্তু স্থির করার জন্য প্যালান্টিয়ারের ‘ম্যাভেন’ সিস্টেমের সঙ্গে অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’ এআই টুলের যুগলবন্দি ব্যবহার করেছে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এআই এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

এই প্রসঙ্গে ‘জর্জটাউন জার্নাল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে গবেষক ক্রিস্টিয়ান হাম্বল একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের চিরাচরিত ব্যবহারের জায়গাটি ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে এই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা। গবেষণাপত্রটিতে আরও বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রবল গতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে।

এই প্রযুক্তিকে ঘিরে কর্পোরেট এবং সরকারি স্তরে টানাপোড়েনও কম নয়। ইরান আক্রমণের ঠিক আগেই মার্কিন সরকার এআই কোম্পানি ‘অ্যানথ্রোপিক’-কে তালিকাচ্যুত করার হুমকি দিয়েছিল। কারণ, কোম্পানিটি সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্র তৈরি বা মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারির কাজে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এই নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হওয়ার পর, প্রতিযোগী কোম্পানি চ্যাটজিপিটি-র নির্মাতা ‘ওপেনএআই’ পেন্টাগনের সঙ্গে দ্রুত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। তা সত্ত্বেও শোনা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনও তাদের ধারাবাহিক হামলায় অ্যানথ্রোপিকের এআই মডেল ব্যবহার করছে, কারণ এটি ‘কিল চেন’ বা হত্যার শৃঙ্খলকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত করে। এই পরিভাষাটি লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে আইনি অনুমোদন গ্রহণ এবং চূড়ান্ত আক্রমণ কার্যকর করা পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ধরনের জটিল হামলার পরিকল্পনা করলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘ডিসিশন কম্প্রেশন’ বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, অদূরভবিষ্যতে সামরিক আধিকারিকরা হয়তো এআই প্রযুক্তির তৈরি করা স্বয়ংক্রিয় হামলার পরিকল্পনাগুলিকে কোনওরূপ বিচারবিশ্লেষণ ছাড়াই সরাসরি অনুমোদন দিয়ে দেবেন। অর্থাৎ, লক্ষ্য স্থির করা থেকে শুরু করে বোমাবর্ষণ— সবই করবে যন্ত্র। ব্রিটেনের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রেইগ জোন্স-এর মতে, এআই-যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এর ব্যবহার স্থগিত রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনেতাদের বর্তমান ব্যর্থতা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, এআই-যুদ্ধের এক ভয়ংকর বিস্তার একেবারে আসন্ন।

স্বাভাবিকভাবেই, এআই ব্যবহারের নৈতিক দিকটি এখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ওপেনএআই তাদের নীতিমালায় বদল এনে সামরিক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। গুগলও তাদের প্রযুক্তিকে যুদ্ধকাজে ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। অন্যদিকে, অ্যানথ্রোপিকের সিইও ডারিও আমোডি আগে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, স্বৈরাচারী দেশগুলির ওপর সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে আমেরিকার উচিত এআই প্রযুক্তিকে পুরোদমে ব্যবহার করা।

তবে, যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নিখুঁত এআই মডেল তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ নির্ভুল ‘ট্রেনিং ডেটা’। এই ডেটাই হল এআই-এর প্রাণভোমরা। যুদ্ধক্ষেত্রের উপলব্ধ তথ্যের বেশিরভাগই অস্পষ্ট, পুরোনো বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। ফলে সেই ডেটা দিয়ে তৈরি এআই মডেল যে তথ্য দেয় তা কতটা নির্ভুল তা নিয়ে সব সময়ই সংশয় থেকে যায়। বিশেষজ্ঞ ক্রেইগ জোন্স স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন কোনও প্রমাণ নেই যে এআই সাধারণ মানুষের মৃত্যু বা ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়; বরং বাস্তবে এর বিপরীতটাই ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।

সব মিলিয়ে, কোনও প্রকার মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে এক চরম বিতর্কের বিষয়। গত ১০ মার্চ শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়র শিরোনামে তাই স্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছে— ‘আইনগত ঐকমত্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বন্ধ করুন।’ তা সত্ত্বেও, মানবজাতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সত্যিকারের যুদ্ধ ক্রমশ কল্পবিজ্ঞানের রূপ নিচ্ছে। এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা, যন্ত্রের নির্লিপ্তি এবং ভুলের প্রবল সম্ভাবনা মানবজাতির জন্য এক অশনিসংকেত বহন করে আনলেও, এ কথা আজ ধ্রুবসত্য যে, যুদ্ধ আটকানো যেমন সম্ভব নয়, তেমনই যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ক্রমবর্ধমান প্রয়োগ আটকানোও কার্যত অসম্ভব।

(লেখক আইএসআই-কলকাতা’র রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *