সুনীতা দত্ত
‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’— এই আপ্তবাক্য যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমরা নিরন্তর ছুটে চলেছি। কিন্তু প্রকৃত সুস্থতার অধিকারী হতে গেলে শুধু নিজের নয়, চারপাশের প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। সকলে সুস্থ থাকলেই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই প্রতি বছর ২৪ মার্চ পালিত হয় ‘বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস’। এই দিনটির মূল লক্ষ্যই হল যক্ষ্মা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো।
পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে প্রতি ১১ সেকেন্ডে একজন যক্ষ্মারোগীর মৃত্যু হয়। এই ভয়াবহতা রুখতে ভারত সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ যক্ষ্মামুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যপূরণের কাজ বর্তমানে পুরোদমে চলছে। আর্থসামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া যক্ষ্মারোগীদের পর্যাপ্ত পুষ্টি অত্যন্ত জরুরি। কারণ, সঠিক পুষ্টি ছাড়া এই মারণরোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন। বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার ‘নিক্ষয় পোষণ যোজনা’ চালু করেছে। এই প্রকল্পের অধীনে প্রত্যেক যক্ষ্মারোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন।
কিন্তু সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এত বড় লড়াইয়ে জয়লাভ করা কার্যত অসম্ভব। তাই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা সুনিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী রোগীদের পুষ্টির মাত্রা বাড়াতে ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চালু হয় ‘নিক্ষয় মিত্র’ প্রকল্প। এর মূল উদ্দেশ্য হল যক্ষ্মারোগীদের দত্তক নেওয়া এবং তাঁদের পুষ্টির দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা। এই অভিনব উদ্যোগটি আজ সমাজের বুকে এক অটুট বন্ধুত্বের অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
নিক্ষয় মিত্র হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ। সমাজের যে কোনও শ্রেণির মানুষ, ছাত্রছাত্রী, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলিও এই প্রকল্পের মাধ্যমে রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পারে। এখানে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই যে কেবল স্বাস্থ্যকর্মী বা সরকারি কর্মচারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যে কেউ স্বেচ্ছায় এক বা একাধিক রোগীর দায়িত্ব নিতে পারেন। সাধারণত যক্ষ্মারোগীদের একটানা ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। দীর্ঘ এই চিকিৎসাকালে নিক্ষয় মিত্ররা রোগীদের প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫০০ টাকার সমমূল্যের পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সাহায্য করেন। এই সাহায্যের ফলে অবহেলিত মানুষগুলো বুঝতে পারেন, গোটা সমাজ তাঁদের পাশেই রয়েছে।
চিকিৎসা চলাকালীন একজন রোগীর মানসিক জোর বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত পুষ্টির জোগান সুনিশ্চিত করাই নিক্ষয় মিত্রদের প্রধান কাজ। অত্যন্ত সাধুবাদ জানানোর মতো বিষয় যে, ইতিমধ্যেই প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ নিক্ষয় মিত্র হিসেবে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছেন। তাঁরা পরম মমতায় যক্ষ্মারোগীদের দত্তক নিয়ে ওষুধ চলাকালীন তাঁদের খাদ্যের ব্যবস্থা করছেন এবং অন্ধকার জীবনে আশার আলো দেখাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের এই নিরলস লড়াইয়ে আজ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান এক অভূতপূর্ব মাইলফলক। সামাজিকতার এই সুন্দর ঘেরাটোপে ক্ষয়রোগকে জয় করার সম্মিলিত প্রয়াসই ভারতকে যক্ষ্মামুক্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, ‘নিক্ষয় মিত্র’ শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি বন্ধুত্বের এক গভীর পরশ, যা রোগজর্জর প্রতিকূলতার মাঝেও মানবিকতাকে সযত্নে রক্ষা করে।
(লেখক স্বাস্থ্যকর্মী। গয়েরকাটার বাসিন্দা।)
