মুম্বইয়ের রাস্তায় অটো ও ক্যাবচালকদের মারাঠি ভাষা নিয়ে পরীক্ষা চলছে। কতটা বাস্তবসম্মত সেটা?
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
রাখির দিনে মুম্বইয়ের দাদারের ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কারও মনে হতে পারত, হয়তো ভুল করে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সম্মেলনে ঢুকে পড়েছেন।
গাড়ির অ্যাক্সিলারেটারে পা। চোখ মিটারে। অথচ চালকের মস্তিষ্কে তখন চলছে মারাঠি ব্যাকরণের বিভক্তি নিয়ে গভীর অঙ্ক। অথবা জনপ্রিয় মারাঠি সাহিত্যিক বিষ্ণু বামন শিরওয়াদকারের কোনও গল্প নিয়ে।
মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারের ফরমান জারি হয়েছে। অটো বা ক্যাব চালাতে গেলে মারাঠি ভাষায় পাশ করতে হবে। মৌখিক এবং লিখিত পরীক্ষা। লাইসেন্স নবায়নের চাবিকাঠি এখন মারাঠি অভিধানের পাতায়।
ফলম, ফলে, ফলানি এবং ফেলম। অধিকাংশ চালকই ফেল করলেন।
টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় পড়লাম, ব্যাপক ফেলের বহর দেখে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ কিছুটা নরম। চালকদের তিনি আরও এক বছর সময় দিয়েছেন। মানে ব্যাকরণ শুধরে নিতে বারো মাসের গ্রেস পিরিয়ড।
কমেডি অবশ্য জমে উঠেছে এর মধ্যেই। ফড়নবিশের জোটসঙ্গী একনাথ শিন্ডের শিবসেনা এক কাণ্ড বাধিয়েছে। মারাঠি শেখার শংসাপত্র দেওয়ার মঞ্চেই গমগম করে বাজিয়েছে চটুল ভোজপুরি গান। মারাঠি অস্মিতার এমন রসালো ভোজপুরি পরিণতি দেখে কার না হাসি পায়!
এই যে রসিকতাময় দৃশ্যাবলি, তার মধ্যে কিন্তু একটা গম্ভীর রাজনীতির অঙ্ক রয়েছে। এর পিছনে কাজ করছে বিজেপি ও দুই শিবসেনার ভোট টানার অঙ্ক। ট্যাক্সি-অটোচালকদের নিয়ে এই পাশ-ফেলের জটিলতা দুই শিবসেনার ঝামেলার ফল। বহিরাগত চালকরা বিজেপির ভোটব্যাংক। তারা এসব পরীক্ষা-টরীক্ষায় প্রথমে সায় দেয়নি। সায় দিতে বাধ্য হয়েছে।
কেন? মহারাষ্ট্র স্কুল দপ্তর সম্প্রতি স্কুলে হিন্দি বাধ্যতামূলক করেছে। শিক্ষা দপ্তর শিন্ডে শিবসেনা পার্টির নেতার হাতে। হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নে নতুনভাবে জেগে উঠেছে ঠাকরে ভাইরা। উদ্ধব-রাজদের মিলন হয়েছে মাসকয়েক। তারা আবার শিন্ডে শিবসেনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে প্রবলভাবে। চালকদের জগতে এখনও দাপট শিবসেনার। সম্প্রতি বিজেপি সরকার সেখানে বাইক ট্যাক্সি চালু করায় ব্যবসা মার খাচ্ছে অটো, ট্যাক্সিচালকদের। এই আবহে স্থানীয়দের তোষণ শুরু হয়েছে মুম্বইয়ে।
হিসেব বলছে, বাণিজ্যনগরীর স্টিয়ারিং ধরা হাতের বড় অংশটাই বাইরের রাজ্যের। আঠারো লক্ষ চালক এসেছেন উত্তরপ্রদেশ থেকে। গুজরাতের সাড়ে ছ’লক্ষ। কর্ণাটকের পৌনে চার লক্ষ। রাজস্থানের সওয়া তিন লক্ষ। বিহারের প্রায় তিন লক্ষ। বাংলা থেকেও গিয়েছেন দু’লক্ষ মানুষ। এই বিশাল বহিরাগত বাহিনী এখন খাতা-কলম হাতে মারাঠি ব্যাকরণ মুখস্থ করছে। পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভের শেষ নেই। খবরের কাগজে চালকদের বক্তব্য ছাপা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র নাকি একেবারে পাঠক্রমের বাইরে এসেছে। এসব শুনে অন্য কথা ভাবার চেষ্টা করছিলাম। বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কিন্তু অনেক হিন্দি শব্দ বাঙালি নেতাদের ভাষণে ঢুকে পড়ছে। বরিষ্ঠ, কার্যকর্তা, প্রভারী, বুথ প্রমুখ, সংকল্পপত্র, ভূমিপূজন, চিন্তন শিবির, গৃহ সম্পর্ক অভিযান…। উন্নয়ন হয়ে গিয়েছে বিকাশ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি হয়ে যাচ্ছে জুমলা।
যাত্রী ওঠানোর সময় দরকার পড়ে সাধারণ কিছু কথা। যেমন, কোথায় যাবেন, ভাড়া কত, খুচরো দিন। অথচ পরীক্ষায় জানতে চাওয়া হচ্ছে ভারী ভারী শব্দ। চালকদের দাবি, এই জটিল মারাঠি তো অনেক খাস মুম্বইকরও বলতে পারবেন না।
এদৃশ্য ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। ধরা যাক, কলকাতার ক্যাব কিংবা শিলিগুড়ির টোটোচালকদের জন্যও এমন নিয়ম চালু হল। আসানসোলের অটোস্ট্যান্ডে হঠাৎ বসল বাংলা ব্যাকরণের আসর। তখন হয়তো দেখা যাবে, ধর্মতলার মোড়ে কোনও চালক যাত্রীকে ‘যাব না’ বলছেন না। তিনি হয়তো ব্যাকরণ মেনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, ‘হে পথিক, ভবানীপুর অভিমুখে আমার যান চালনা ব্যাকরণগত কারণে অসম্ভব।’
মহারাষ্ট্রের এই ফর্মুলা বাংলায় এলে কী হতে পারে?
ভাবুন তো, হাওড়া স্টেশনের প্রিপেড বুথে চালকদের সাক্ষাৎকার চলছে। প্রশ্নকর্তা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করছেন, ট্যাক্সি মিটারের সমাস কী হবে? কিংবা বলছেন, ব্যোমকেশ বক্সী আর ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির তুলনামূলক পার্থক্য না বলতে পারলে কসবায় ঢোকার ছাড়পত্র মিলবে না। সাতসকালে উলটোডাঙ্গার অটোচালককে মুখস্থ বলতে হবে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা। নয়তো লাইসেন্স বাতিল।
এমন হলে শহরের অটোর পেছনের চটুল শায়েরিগুলো রাতারাতি বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় হয়ে যাবে।
আমরা প্রায়ই আলোচনা করি, বাংলা থেকে কীভাবে পরিযায়ী শ্রমিকরা চলে যাচ্ছেন ভিনরাজ্যে। আমরা কিন্তু সেভাবে বলি না, কলকাতা সহ বাংলার নানা শহরে বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশের কত বাসিন্দা এসে নানা ধরনের কাজ করেন। লরি, ট্যাক্সির জগতে অধিকাংশই বিহার, ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। এখন কলকাতায় উবর, ওলায় উঠলেও দেখবেন অধিকাংশ চালক হিন্দিভাষী। অনেকেই সটান বলে দেন, বাংলা জানেন না। পাহাড়ে গাড়ি নিয়ে গেলেও এক কথা শুনবেন। এটাও কোনও কাজের কথা নয়।
এখানে একটা অকাজের কথা। অধিকাংশ বাঙালি দরিদ্র মানুষরা বাংলার বাইরে কাজে গেলে তাঁদের পরিযায়ী বলেন। অথচ তাঁদের পরিবারের ছেলেরা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, শিক্ষক হয়ে বাংলার বাইরে গেলে গর্ববোধ করেন। অথচ পরিযায়ী সবাই।
মহারাষ্ট্রের কথা লিখছিলাম। মহারাষ্ট্র একা নয়। এই পরিস্থিতি ছড়িয়েছে দক্ষিণ ভারতেও। সে তো অনেকদিনই। সেখানে ভাষাগত অস্মিতা প্রচুর।
কর্ণাটকে অনেকদিন ধরেই কন্নড় শেখার জন্য অটোচালকদের ওপর তুমুল চাপ। অনেক জায়গায় কন্নড় না জানলে অটোতে কন্নড় পতাকা লাগানো বাধ্যতামূলক।
তামিলনাডুতে তামিল ছাড়া এক পা এগোনো দায়। সেখানে ভিনরাজ্যের চালকদের প্রতিদিন ভাষার পরীক্ষায় বসতে হয় মোড়ে মোড়ে।
কেরল কিংবা অন্ধ্রপ্রদেশেও স্থানীয় ভাষার দাপট কম নয়। মালয়ালম কিংবা তেলুগু না জানলে যাত্রীর সঙ্গে ভাড়ার হিসেব মেলাতেই চালকের কালঘাম ছুটে যায়।
দক্ষিণ ভারতের চার রাজ্যের কাছে ভাষা স্রেফ ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়। ভাষা তাঁদের কাছে আত্মপরিচয়। অস্তিত্বের লড়াই।
তামিলনাডু শিক্ষানীতি আঁকড়ে রেখেছে আপসহীনভাবে। সেখানে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার কোনও জায়গা নেই। সব স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তামিল পাঠ বাধ্যতামূলক। দোকানের সাইনবোর্ডে বড় হরফে তামিল লেখা আইনত জরুরি। তামিল ভার্চুয়াল অ্যাকাডেমির মাধ্যমে প্রাচীন পুঁথি ডিজিটাল রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে প্রাচীন তামিল সাহিত্য পৌঁছে দিতে বিপুল অর্থবরাদ্দ করছে প্রশাসন।
কর্ণাটকও একই পথে। রাজ্য সরকার কন্নড় ভাষা উন্নয়ন আইন কার্যকর করেছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ষাট শতাংশ কন্নড় হরফ থাকা বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক স্তর থেকে কন্নড় শেখা আবশ্যিক। স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানে কন্নড় জানা প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে সক্রিয় নজরদারি সেল।
কেরলে মালয়ালমকে বাঁচাতে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী উদ্যোগ। সরকারি স্কুল থেকে বেসরকারি ইংরেজিমাধ্যম, সর্বত্র মালয়ালম পড়ানো বাধ্যতামূলক। প্রশাসনের সমস্ত ফাইলের কাজ ও সরকারি নির্দেশিকা মাতৃভাষায় রূপান্তরের জন্য তৈরি হয়েছে কড়া নজরদারি। ইন্টারনেটে মাতৃভাষার চর্চা বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে তৈরি বিশাল ডিজিটাল সংরক্ষণাগার।
অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগুকে আধুনিক রূপ দেওয়ার কাজ চলছে। সব স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তেলুগু বিষয় হিসেবে রাখা বাধ্যতামূলক। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে তেলুগু ব্যবহারের নিয়ম চালু। প্রাচীন তেলুগু সাহিত্য ও আধুনিক গবেষণার জন্য আলাদা পর্ষদ কাজ করছে। তেলুগু লেখকদের জন্য রয়েছে বিশেষ আর্থিক অনুদান।
নয়াদিল্লি থেকে ভেসে আসা একমুখী স্রোতকে এই চার রাজ্য সহজেই মেনে নেয়নি। ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে শুধু আবেগে ভাসা নয়। প্রশাসনিক কড়াকড়ি আর অর্থনৈতিক সুরক্ষাই দক্ষিণ ভারতের আসল শক্তি।
কিন্তু সত্যি কি ভাষা দিয়ে রুটিরুজির চাকা আটকানো যায়? চাকার কি কোনও ভাষা থাকে?
রাস্তার তো কোনও নিজস্ব বর্ণমালা নেই। পেট্রোল-ডিজেলের গন্ধ ও দাম সব ভাষাতেই এক।
ক্যাব কিংবা অটোচালকের আসল কাজ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো। ঠিকঠাক ব্রেক কষা। যানজটের মধ্যে মাথা ঠান্ডা রাখা। তাঁদের কাজ সাহিত্য অাকাদেমি পুরস্কার নেওয়া নয়।
মুম্বইয়ের আঠারো লক্ষ উত্তর ভারতীয় কিংবা দু’লক্ষ বাঙালি চালক মারাঠি বলতে গিয়ে হয়তো চন্দ্রবিন্দু গুলিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তাঁরা শহরের রক্ত সঞ্চালন চালু রেখেছেন চব্বিশ ঘণ্টা। শিন্ডের সহযোগীদের মঞ্চে ভোজপুরি গান হয়তো ভুল করে বেজে ওঠেনি। ওটাই বাস্তবের সুর।
বাস্তবেরর রুক্ষতা আসলে কোনও কৃত্রিম পাঠক্রম মানে না। রাজনীতির ব্যাকরণ যা-ই বলুক, পেটের ভাষা সবসময় সব সিলেবাসের বাইরেই থাকে।
The publish মুম্বই মেরি জান, মারাঠি শেখাও মোরে! appeared first on Uttarbanga Sambad.
