- মলয় চক্রবর্তী
শীত নামলেই রসনাতৃপ্তির টানে বাঙালির মন প্রথমে যে স্বাদের দিকে ছুটে যায়, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পিঠার অপার আমন্ত্রণ। এপার বাংলায় ‘পিঠে’, ওপার বাংলায় ‘পিঠা’—একই রন্ধন ঐতিহ্যের দুই নাম, কিন্তু বাংলাদেশের পিঠার ঐশ্বর্য যেন একটু আলাদাই। নতুন ধানের আতপচাল, তাজা খেজুরগুড়, মোলায়েম পাটালির সুবাস আর চুলোর ধোঁয়ার উষ্ণতায় যে স্বাদময়তার জন্ম হয়, তা যেন শীতের গ্রামীণ জীবনের অতুলনীয় রূপকথা। বাংলাদেশের নানা জেলায় শীত মানেই পরিবারের পর পরিবারে পিঠা তৈরির উৎসব, যেন একটি মৌসুমি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। শিশু অ্যাকাডেমির উদ্যোগে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে ‘পিঠা উৎসব’ সেখানকার শীতকে এক অনন্য সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত করেছে, তা আজ রন্ধনশৈলীকে অতিক্রম করে এক মানবিক উত্সবের রূপ নিয়েছে। ঘরে ঘরে মায়েরা, বধূরা, অনূঢ়ারা যেন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন—কে কত অভিনব পিঠা তৈরি করতে পারেন, কার হাতের স্বাদে মুগ্ধতা বেশি। বাঙালির চিরন্তন অতিথি-সংস্কৃতি তাই এই শীতকালীন রসনার মাধ্যমে আবারও পুনর্জাগরিত হয়। আমরা সাধারণত পিঠেকে শুধুই মিষ্টির পরিধিতেই ভাবি; খেজুর রস, চিনির সিরা বা ক্ষীরসার আশ্রয়ে তৈরি স্বাদই যেন পিঠের আদি-মূর্ত।
কিন্তু বাংলাদেশের পিঠার ইতিহাস বলছে অন্য কথা- সেখানে নোনতা, ঝাল এবং ডিম, মাছ, মাংস ও শুঁটকি-সংবলিত পিঠারও এক বিস্ময়কর ধারা রয়েছে। এপার বাংলায় যা তেমন পরিচিত নয়, তা ওপারে বহু শতাব্দী ধরে স্বীকৃত শৈল্পিক খাদ্যসংস্কৃতি। কাঁঠাল পাতায় ভাপে ওঠা ‘সাগু দানা পিঠা’, সন্ধ্যামণি ফুলের মতো আকৃতির ‘সন্ধ্যামণি পিঠা’, দুধ-নারকেলের পরম মেলবন্ধনে গড়া ‘গোকুল পিঠা’, অভিজাত বিয়েবাড়ির ভেট- ‘ফুল অন্দরসা’, ঝাল-মশলা-ডিমের সমন্বয়ে ‘ডিমের পিঠা’, নৌকার মতো আকৃতির পুরোনো দিনের ‘কাটা পিঠা’, কিংবা বরিশালের প্রবাদপ্রতিম ‘কুয়োরা পিঠা’। বাংলাদেশের পিঠার নামলগ্নই যেন তার সৃষ্টি-কাহিনী বলে দেয়। কোথাও তিলের গন্ধ, কোথাও পোস্তর মোলায়েম সংস্পর্শ, কোথাও শুকনো লংকার দহনে লেগে থাকা গ্রামীণ ঝাঁঝ—প্রত্যেকটি পিঠা যেন একেকটি অঞ্চলের নিজস্ব কণ্ঠস্বরে রচিত স্বাদ-স্মৃতি। আতপচাল, পাকা কলা, নারকেল কোরা, দুধ, এলাচ, দারুচিনি, পেস্তা, ক্ষীরসা, মাছ, মাংস, শুঁটকি- বাংলাদেশের পিঠাশিল্প এই বহুবর্ণ উপাদানের মেলবন্ধনে এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের জন্ম দিয়েছে।
ফলে পিঠা আর কেবল শীতের খাবার নয়—এটি এক অঞ্চলের ইতিহাস, স্বাদস্মৃতি, খাদ্যবোধ এবং ঘরোয়া সৃজনশীলতার ধারক। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিকতার ঝড়, শপিং মল ও পাঁচতারা হোটেলের পরিচিত জগৎ এই পিঠা-ঐতিহ্যকে মুছে দেয়নি। বরং উলটোটাই ঘটেছে—পিঠা আজ শহুরে পরিবেশে নতুনভাবে জনপ্রিয়, স্বাস্থ্যকর রন্ধনশৈলী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শীতের সন্ধ্যায় বাঙালির মন তাই অনিবার্যভাবে মনে করে সেই ওপারের স্বাদ; অনেকেই বলেন—‘বাংলাদেশের পিঠা খাইতে বড় মিঠা।’ শীতের শুরুতেই যাঁরা কখনও বাংলাদেশের পিঠার সুধাস্বাদ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মনের জানলা খুলে যায় সেই স্মৃতির দিকে—খেজুর গুড়ের সুবাস, দুধ-নারকেলের উষ্ণতা, আর আতপচালের ভাপা গন্ধ। এই কারণেই প্রবচনের মতোই শোনায়—পিঠার জন্য পিঠে পড়লেও বাঙালির ক্ষতি নেই। আজ পশ্চিমবঙ্গেও গ্রামের মাটিতে পিঠা তৈরির সেই আবহ ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। তবু স্বীকার করতেই হয়, পিঠার যে সুবিন্যস্ত বৈচিত্র্য বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে রক্ষিত রয়েছে, তার কোনও তুলনা নেই।
বাংলাদেশের পিঠা শুধু খাদ্য নয়—একটি জাতির স্মৃতি, উৎসব, আনন্দ, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মেলবন্ধন। শীতের হাওয়া লাগলেই তাই মন আপনিই বলে ওঠে—শীতের সবচেয়ে মধুর স্বাদ লুকিয়ে আছে ঐতিহ্যে, আর সেই ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ নাম—বাংলাদেশের পিঠা।
(লেখক শিক্ষক। ঘোকসাডাঙ্গার বাসিন্দা)
