গুটিয়ে যাওয়ার পথে জুলাই বিপ্লব। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন পরবর্তী বাংলাদেশ তাই নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৪-এর ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’র কান্ডারিরা কার্যত ছত্রভঙ্গ। তাঁদের একদল মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোয় অস্তিত্ব সংকটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্র নেতাদের তৈরি এই এনসিপি। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে এনসিপি’র জোট এখন অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
জামায়াতে এবং এনসিপি’র কাছে এই জোট কার্যত বাধ্যবাধকতার রাজনীতি। একথা আর গোপন নেই যে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের অনুপ্রবেশ ছিল। ছাত্রদের ওই আন্দোলনকে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতে নিয়ে যাওয়ার মূল উসকানি ছিল জামায়াতের। সেই উদ্দেশ্য সফল হলেও জামায়াতের ক্ষমতা দখল নিয়ে সংশয় যথেষ্ট। বরং বাংলাদেশজুড়ে অরাজকতার পরিবেশের সুবাদে জামায়াতের বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট টাল খেয়েছে। একার পক্ষে নির্বাচনে লড়ে শাসনক্ষমতা দখলের জায়গায় এখন আর নেই জামায়াতে।
আওয়ামী লিগের পর বিএনপি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে স্বাভািবক পছন্দের তালিকায় রয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপি’র পালে হাওয়াকে আরও জোরালো করেছে। ফলে নিজের পরিসর বাড়াতে এখন মরিয়া জামায়াতে। সেই লক্ষ্যে এনসিপি’র সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় তাদের আগ্রহ থাকা খুব স্বাভাবিক। অন্যদিকে, যত নির্বাচন এগিয়ে আসছে, তত মোল্লার দৌড় যে মসজিদ পর্যন্ত, নিজেদের সম্পর্কে সেই উপলব্ধি হচ্ছে এনসিপি’র একাংশেরও।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এনসিপি’তে শামিল তরুণ প্রজন্মের সবাই মৌলবাদী ভাবনার শরিক নন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামিকে অপছন্দ তাঁদের অনেকের। কেউ কেউ আবার কিছুটা হলেও সর্বধর্মসমন্বয়ের পক্ষে। সেই কারণে জামায়াতে-তে ভিড়ে না গিয়ে তৈরি করতে হয়েছিল আলাদা দল। পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশের আরও একটা কারণ ছিল। তা হল ক্ষমতার লোভ। হাসিনাকে তাড়িয়ে দেশের শাসক হয়ে ওঠার বাসনা পেয়ে বসেছিল এই ছাত্র নেতাদের।
কিন্তু ক্রমে এই নেতারা বুঝতে পেরেছেন, মৌলবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় নৈরাজ্য সৃষ্টি যত সহজ, নির্বাচনি সাফল্যলাভ তত কঠিন। শহর এলাকায় সমর্থন মোটামুটি থাকলেও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এনসিপি’র পায়ের তলায় যে জমি খুব কম, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এতে অস্তিত্ব সংকট তৈরি হওয়ার ভয় পেয়ে বসেছে এনসিপি-কে।
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিএনপি’র পক্ষে দেশজুড়ে উন্মাদনার আবহ সেই আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াতের লেজ ধরে তাই নাহিদ ইসলাম, সারজিস, হাসনাতের মতো নেতারা যে কোনও মূল্যে ক্ষমতার শরিক হতে মরিয়া। দলের উল্লেখযোগ্য অংশের আপত্তি ও বিরোধিতা সত্ত্বেও তাই এনসিপি-কে তাঁরা জামায়াতের জোটসঙ্গী করে ফেললেন। তাতেও নির্বাচনি অঙ্কে শেষরক্ষা হবে কি না, তা জামায়াতে ও এনসিপি’র পক্ষে অনিশ্চিত।
শেষপর্যন্ত দেশ-বিদেশের নানাবিধ চক্রান্তে নির্বাচন ভেস্তে না গেলে জামায়াতের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা প্রবল। সেই শক্তির উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে অন্তত এখন থাকতে চাইছেন এনসিপি’র ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নেতারা। উভয়পক্ষের তাগিদে তাই এই নির্বাচনি জোট। তবে ক্ষমতা দখল পুরোপুরি অনিশ্চিত মনে করলে এই দুই শক্তি মিলিতভাবে ভোট বানচালের মরিয়া চেষ্টা করতে পারে। সেই চেষ্টা সফল হবে কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি।
রাজনীতির সাপলুডোর খেলায় বিএনপি শাসকদল হয়ে উঠতে পারবে কি না, সেটাও ১০০ শতাংশ নিশ্চিত বলা যাবে না। তবে ওই খেলায় জামায়াতের চেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে এনসিপি-তে। ইতিমধ্যে প্রথম সারির পাঁচজন নেতা এনসিপি’র সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য জোটে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। শীর্ষ নেতৃত্ব জোটে অনড় থাকলে ক্ষমতালিপ্সু ছাত্র নেতাদের স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
The put up ‘বিপ্লবে’র পরিণতি appeared first on Uttarbanga Sambad.
