মারিয়ার মাথায় মুকুট, তবে কাঁটার

মারিয়ার মাথায় মুকুট, তবে কাঁটার

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


 

মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্যারিস্কা। ক’জন এই নাম আগে  শুনেছেন সন্দেহ আছে। একমাত্র লাতিন আমেরিকার হালহকিকত নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামান তাঁরাই জানতে পারেন। ভেনেজুয়েলার বাসিন্দা মারিয়া দুনিয়াজোড়া খ্যাতির সূত্রে এখন বেশ পরিচিত এক নাম। তিনি এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াইয়ের স্বীকৃতি।

আর তারই সঙ্গে উঠে এসেছে একগাদা সমালোচনা। খ্যাতির চেয়ে এখন দুর্নামের পাল্লাও কম নয়। ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে মারিয়া বহুদিন ধরে যুক্ত। ৫৮ বছরের এই অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর মহিলার রাজনীতির জীবন শুরু সীমান্তে নামে এক সংস্থাকে দিয়ে। তাঁরই তৈরি এই সংস্থার কাজ ছিল ভোট পর্যবেক্ষণের। তারপর ক্রমেই আরও জড়িয়ে পড়া দেশের রাজনীতির সঙ্গে। রাজনৈতিক দল ভেন্তে ভেনেজুয়েলার প্রার্থী হয়ে ২০১২ সালে বিরোধীদের প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাইমারিতে লড়াই করে হেরে গিয়েছিলেন। সেখানকার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেতৃত্বও দিয়েছেন। তার আগে তিনি জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে জয়ী হয়েছিলেন।

এরপর ২০২৩ সালে মারিয়া প্রেসিডেন্ট পদে প্রাথমিক লড়াইয়ে জিতে যান। পরের বছর ভেনেজুয়েলার সরকার তাঁকে ভোটে লড়তে বাধা দেয়। মারিয়া ছিলেন ঐক্যবদ্ধ বিরোধী প্রার্থী। তাঁর বদলে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে যিনি দাঁড়ান তিনি বহু ভোটে জিতে গিয়েছেন বলে বিরোধীরা দাবি করলেও তা মানতে চায়নি মাদুরো সরকার। তারা দাবি করে জয়ী হয়েছেন মাদুরো।

এরই মধ্যে মারিয়া পরিচিত হতে থাকেন দেশের বাইরে। বিবিসি আর টাইম ম্যাগাজিনে সেরা মহিলার তালিকায় মারিয়ার নাম উঠে যায়। হাতে আসে ভাক্লাভ হাভেল আর শাখারভ পুরস্কার। মুক্তচিন্তার জন্য শাখারভ পুরস্কারটি দিয়েছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। আর এইবার বহু প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার। পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় এই ক’টি কথা বললে মারিয়াকে পুরোটা ধরা যাবে না। একইসঙ্গে বলতে হবে আরও বেশকিছু কথাও। দু-দু’বার রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ২০০২ সালে একবার। সেবার তখনকার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট উগো সাভেজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল মারিয়ার বিরুদ্ধে। তখন সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে দেওয়ার ঘোষণাপত্রে সই করেছিলেন তিনি। পরেরবার সাভেজকে উৎখাতের জন্য গণভোটের আয়োজন করার দায়ে। সেসময় মার্কিন গোয়েন্দা সংগঠন সিআইএ-র মদত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে মারিয়ার বিরুদ্ধে।

আর ঠিক এইখানেই মারিয়াকে নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত। উগো সাভেজ আর তাঁর পরের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সোশ্যালিস্ট  পার্টির নেতা। কট্টর মার্কিন বিরোধী। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে একবার বেশ ঘটা করে এ রাজ্যে আনা হয়েছিল উগো সাভেজকে। বেশ কয়েকটা পঞ্চায়েত ঘুরে দেখানো হয় তাঁকে, দক্ষিণ আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আইকন হিসেবে। ফলে নানাভাবে ভেনেজুয়েলা জড়িয়ে পড়ে আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য কোনও রাখঢাক না করে নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর জন্য সিআইএ-কে অনুমোদন দিয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে মাদকবাহী নৌকার দোহাই দিয়ে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে কম করেও পাঁচবার হামলা চালিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যা বলে দাবি করেছে। এই মার্কিন হামলায় ২৭ জন নিহত হয়েছে। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, মাদক পাচার বন্ধ করতে তারা সমুদ্রের সঙ্গে এবার স্থলেও অভিযান চালাবে। ভেনেজুয়েলা থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্ত বর্ডার ব্লাডশেড বা সীমান্তে রক্তপাত বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প। মারিয়ার নোবেল প্রাপ্তির পর পত্রপাঠ অসলোতে নরওয়ের ভেনেজুয়েলার দূতাবাস বন্ধ করা হয়েছে। নোবেল পুরস্কার দেন সে দেশের রাজা। তাই এই সিদ্ধান্ত।

এই প্রেক্ষাপটে মারিয়ার প্রবল মার্কিন প্রীতি সকলেরই চোখে পড়েছে। তিনি তাঁর নোবেল উৎসর্গ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। এর আগেও মাদুরোকে হটাতে খোলাখুলি মার্কিন সাহায্য চেয়ে বিতর্ক বাড়িয়েছেন মারিয়া। কোনও রাখঢাক ছিল না। ফলে বামপন্থী মহলে তাঁকে ‘সাম্রাজ্যবাদীদের দোসর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বহুদিন যাবৎ। মাদুরোকে ‘মাদক কারবারিদের মদতে চলা রাষ্ট্রকাঠামো’-র প্রধান বলে বর্ণনা করেছেন। ফলে আমেরিকার কাছে মারিয়া অতি প্রিয় হয়ে উঠেছেন দিনে-দিনে। মারিয়াকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পাঠিয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে আছেন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শদাতা সেদেশের স্বরাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিও।

বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। মারিয়া ইজরায়েলের বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কট্টর সমর্থক। ২০২০ সালে মারিয়া নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী লিকুদ পার্টির সঙ্গে চুক্তি করেছেন। গাজায় নৃশংস বর্বরতার জন্য যখন আন্তর্জাতিক আদালতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে তখন মারিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন প্রবল নিন্দার মুখে পড়েছে। তাঁকে মুসলিমবিরোধী বলে বর্ণনা করা হচ্ছে চতুর্দিকে, বিশ্বব্যাপী প্রবল নিন্দার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে নোবেল শান্তি পুরস্কারের নিরপেক্ষতা নিয়ে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে নাকি বামবিরোধী, দক্ষিণপন্থী, মুসলিম বিদ্বেষী নেত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে মারিয়ার নাম। এখন খোলাখুলি চর্চা তা নিয়ে। তিনি ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমর্থক এবং সেখানকার তেলের উপর সরকারি মালিকানা তুলে দেওয়ার পক্ষে। বহুদিন ধরে সেটাই চেয়ে আসছে আমেরিকা। তাদের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল। ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পাবলো ইগলেসিয়াসের ভাষায়, যিনি নিজের দেশে সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানের লাগাতার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন তাঁকে নোবেল দেওয়ার বদলে তা সরাসরি ট্রাম্পকে দেওয়া উচিত ছিল। কিংবা মরণোত্তর পুরস্কার হিসেবে হিটলারকে।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *