(ইংরেজি শেখার প্রয়োজন অনস্বীকার্য, কিন্তু বাংলা ভাষার চর্চা ও মর্যাদা রক্ষায় সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।)
রুদ্র সান্যাল
বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা। কিন্তু প্রশ্ন কেবল সরকারি দপ্তরে বাংলার ব্যবহার নয়; প্রশ্ন, বাঙালির ঘরে ও সমাজে বাংলা ভাষার অবস্থান কোথায়? বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়; এটি বাঙালি জাতির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তিও বটে। সাহিত্য, শিল্প ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে এই ভাষার পরতে পরতে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জীবনযাত্রার অভিঘাতে বাংলা ভাষার ব্যবহারেও লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। কলকাতা, শিলিগুড়ি থেকে শুরু করে জেলা ও গ্রামাঞ্চলেও আজ একই সংকটের ছবি ফুটে উঠছে। মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহার ও গভীর সাহিত্যপাঠের প্রবণতা ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছে। ইংরেজিমাধ্যমের প্রতি ঝোঁক, ডিজিটাল বিনোদনের প্রসার এবং পারিবারিক স্তরে বাংলার ব্যবহার কমে যাওয়ার মতো নানামুখী কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যুক্তিতে ইংরেজি শিক্ষার জোয়ারকে অস্বীকার করা যায় না। তবে সংকট তৈরি হয় যখন ইংরেজি শেখার তাড়নায় মাতৃভাষাকে অবহেলা করার মানসিকতা তৈরি হয়। অনেক পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বাংলা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা দেখা যায়।
এর ফলে ‘আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’ আজ আধুনিক বাঙালি সমাজের বহু তরুণ-তরুণীর বাস্তব চিত্র। নিজের মাতৃভাষায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে বা সঠিক বানান-ব্যাকরণে লিখতে না পারাটা আজ অনেকের কাছে যেন আধুনিকতার পরিচায়ক হয়ে উঠছে। এই উদাসীনতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সংস্কৃতির আবহাওয়ায়। বইমেলায় ভিড় থাকলেও গভীর পাঠাভ্যাসের বিস্তার আগের তুলনায় কমেছে বলেই মনে করেন অনেকেই। ডিজিটাল বিনোদনের প্রভাবে নতুন প্রজন্ম দীর্ঘ পাঠাভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির সম্পদ, বিশেষ করে ভাওয়াইয়ার মতো লোকসংগীতও আধুনিক বাণিজ্যিক বিনোদনের ভিড়ে প্রান্তিক হয়ে উঠছে এবং উত্তরবঙ্গের স্থানীয় মেলাগুলির ঐতিহ্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধুঁকছে।
এই ভাষাগত স্থানচ্যুতি ও অবক্ষয় কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার নির্দেশিকা জারি করে জানিয়ে দিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র ও প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হচ্ছে। প্রশাসনিক স্তরে মাতৃভাষার এই প্রয়োগ বাংলা ভাষাকে তার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যখন প্রশাসনিক স্তরে ভাষার কদর বাড়ে, তখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বের ওপরও পড়ে। তবে কেবল সরকারি আদেশ জারি করে কোনও ভাষাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও পারিবারিক স্তরে যৌথ সাংস্কৃতিক জাগরণ।
পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাহিত্যচর্চা, কাব্য আবৃত্তি, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ও নাট্যচর্চার মতো কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ভাষার প্রতি আকর্ষিত করতে পারে। উত্তরবঙ্গের গ্রন্থাগারগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নবীন পাঠকদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করতে নিয়মিত সাহিত্যসভার আয়োজন করা আজ ভীষণভাবে সময়ের দাবি। পারিবারিক স্তরেও অভিভাবক ও বয়স্কদের দায়িত্ব অপরিসীম। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বাংলা ভাষায় গল্প শোনানো এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা সুকুমার রায়ের সাহিত্যের রসাস্বাদনের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। পারিবারিক পরিবেশ শক্ত হলে সন্তানকে আর বড় হয়ে লজ্জিত গলায় বলতে হবে না যে তার বাংলাটা ঠিক আসে না।
আজকের যুগে প্রযুক্তিকে অনেকে শত্রু মনে করলেও সঠিক ব্যবহারে এটি আশীর্বাদ হতে পারে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, বহু তরুণ ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে মানসম্পন্ন বাংলা কনটেন্ট তৈরি করছেন। অনলাইনের যুগে এই কনটেন্টগুলি নতুন প্রজন্মকে ডিজিটাল মাধ্যমেই বাংলা ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসছে। ভাষা রক্ষা করার অর্থ অন্ধ অতীতবিলাসিতা নয়; বরং পরিবর্তনের প্রবাহকে মেনে নিয়ে নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ইংরেজি শেখার পাশাপাশি তরুণ সমাজ যদি মাতৃভাষার ঐতিহ্যের মূল্যায়ন করতে শেখে, তবেই বাঙালির সত্তা রক্ষা পাবে। ভাষার ভবিষ্যৎ শেষপর্যন্ত সরকারি নির্দেশে নয়, মানুষের ঘর, বিদ্যালয় ও দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যেই নির্ধারিত হয়।
(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

