আশিস ঘোষ
ভোট আসছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। শুধু মারদাঙ্গা নয়, কুকথা, ঘৃণাভাষণের কদর্য প্রতিযোগিতা চলছে। নিছক দল বা নেতার বিরুদ্ধে নয়, ধর্ম, জাতপাত তুলে গালাগাল, বিদ্বেষের বিষ উগড়ে দেওয়ার দৌড় চলছে। কেউ কম যায় না। ভোট এখন আতঙ্কের আরেক নাম।
একটি সমীক্ষা অনুযায়ী গত বছর মোট ১৩১৮টি ঘৃণাভাষণের লক্ষ্য ছিলেন সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টানরা। গড়ে প্রতিদিন চারটি করে বিষাক্ত বুলি বেরিয়ে এসেছে নেতাদের শ্রীমুখ থেকে। ‘নিউ ইন্ডিয়া হেটল্যাব’-এর রিপোর্ট বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর ঘৃণাভাষণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় ৯৭ শতাংশ।
ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, গত বছরের ঘৃণাভাষণের ৯৮ পার্সেন্টের লক্ষ্য মুসলিমরা। তার মধ্যে ১১৫৬টি ক্ষেত্রে তারা সরাসরি টার্গেট, ১৩৩টি কেসে খ্রিস্টানদের সঙ্গে। ১৬২টি ক্ষেত্রে সরাসরি খ্রিস্টানরা লক্ষ্য। সমীক্ষা বলছে, ঘৃণাভাষণ বেশি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোয়। সবথেকে বেশি উত্তরপ্রদেশে ২৬৬টি। তারপরেই মহারাষ্ট্রে ১৯৩, মধ্যপ্রদেশে ১৭২, উত্তরাখণ্ডে ১৫৫টি।
খাস রাজধানী দিল্লিতে ঘৃণাভাষণের ঘটনা ৭৬টি। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতা রঘুরাজ সিং হোলির আগে বলেছিলেন, কোনও গোলমাল যাতে না হয়, সেজন্য মুসলিম পুরুষদের ত্রিপলের হিজাব পরে হোলি খেলা উচিত। তবে ঘৃণাভাষণের চ্যাম্পিয়ন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি। গতবছর তিনি ৭১টি ঘৃণাভাষণ দিয়েছেন। ‘লাভ জেহাদ’, ‘ল্যান্ড জেহাদ’, ‘থুক জেহাদের’ মতো রকমারি ষড়যন্ত্রের কথা বলে বাজার গরম করেছেন।
তাঁর সরকার বেআইনি নির্মাণ ভাঙার নামে নির্বিচারে মুসলিমদের সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সে রাজ্যে কারণে-অকারণে মুসলমানদের হেনস্তা করা জলভাত। সেখানে পরিষ্কার জানানো হয়, হিন্দুরাষ্ট্রে বেশি অধিকার হিন্দুদের। ধামির পর এই তালিকায় আছেন হিন্দু নেতা প্রবীণ তোগারিয়া। তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন ৪৬ বার। বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় ৩৫ বার।
মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নীতীশ রানে নিজেকে হিন্দুদের গব্বর ঘোষণা করে মন্তব্য করেছেন, জেহাদি, বিষধর সাপদের হিন্দুস্থানে ঠাঁই হবে না। বিরোধী সাতটি রাজ্যে গত বছর ১৫৪টি ঘৃণাভাষণ রেকর্ড হয়েছে। এধরনের ৪০টি ঘটনা নিয়ে কর্ণাটক রয়েছে প্রথম দশে। হেটল্যাব-এর রিপোর্ট দেখাচ্ছে, বিরোধীদেরও ঘৃণাভাষণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে বলা হয়েছে বিরোধী নেতার নানা অমৃতভাষণের কথা।
গতবছর প্রায় অর্ধেক ঘৃণা প্রচার ঘুরপাক খেয়েছে নানারকম জেহাদ নিয়ে। লাভ জেহাদ থেকে শুরু করে পপুলেশন জেহাদ, শিক্ষা জেহাদ, ড্রাগ জেহাদ, ভোট জেহাদ ইত্যাদি কি না বলা হয়েছে। আরও উদ্বেগের কথা, ঘৃণাভাষণের ২৩ শতাংশে খোলাখুলি হিংসার কথা বলা হয়েছে। এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। শুধু ভোটের সময়ে নয়, এটা রাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠছে।
আরও বিশদে বিশ্লেষণ করে হেটল্যাব-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, এই ঘৃণা ছড়ানো প্রচারে সবার আগে আছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল। একাজে বিজেপি ও আরএসএস তাদের মুখ হিসেবে এই দুই সংগঠনের ওপর নির্ভর করে। তারাই তাত্ত্বিক কথাগুলো মেঠো ভাষায় ময়দানে নামায়। রামনবমীর শোভাযাত্রা থেকে পহলগামের জঙ্গি হামলার মতো ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে ঘৃণাভাষণের মাত্রা বাড়ে।
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আর রোহিঙ্গাদের নাম করে যা নয় তা তো আছেই বছরভর। ১২০টি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। ২৭৬টি বক্তৃতায় মসজিদ, গির্জা গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গত বছর বিশেষ করে টার্গেট করা হয়েছে খ্রিস্টানদের। হামলা হয়েছে গির্জায়। কেন্দ্র আগাগোড়া নীরব, মূক।
ঘৃণার বিষ ছড়ানোয় লাগাম টানতে গত বছর কর্ণাটকের বিধানসভায় বিল পাশ হয়েছিল। তাতে কিছু কড়া ব্যবস্থার কথা বলা আছে। রাজ্যপালের সম্মতির অপেক্ষায় সেই বিল ঝুলে রয়েছে। প্রস্তাবিত ওই আইনে মৌখিক, প্রকাশিত কথায়, খবরের কাগজে বা টেলিভিশনে, সোশাল মিডিয়ায় যে কোনও ঘৃণাভাষণকে দণ্ডনীয় অপরাধ বিবেচনা করার কথা হয়েছে। তাতে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া হোক বা না হোক। এধরনের যে কোনও বক্তব্যকে রাজ্য মনে হলে মুছতে বলতে পারবে।
এখন এই ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রের। তবে ঘৃণাবচন রুখতে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনও আইন নেই। যা আছে, তা নানা আইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এই আইন পাশ হলে এক থেকে সাত বছর পর্যন্ত জামিন অযোগ্য জেল হতে পারে। সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা। তেলেঙ্গানা সরকার জানিয়েছে, তারাও এমন আইন আনবে। বিজেপি জানিয়েছে, এমন কোনও আইনের প্রয়োজন নেই। আর পশ্চিমবঙ্গ?
