আবীর লাল মন্ডল
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যখন ক্ষমতার আস্ফালন তীব্র হয়, তখন ভারতের মতো দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইরান, ইজরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যে যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও ছায়াযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ কোপ এসে পড়েছে এদেশের কোটি কোটি মানুষের রান্নাঘরে। রান্নার গ্যাসের জন্য দেশজুড়ে যে হাহাকার দানা বেঁধেছে, তা নিছক কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে দেখা যায়, ভারত তার বার্ষিক এলপিজি বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের চাহিদার এক বিশাল অংশ, প্রায় ষাট শতাংশেরও বেশি, মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। তেহরান এবং তেল আভিভের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে আগুন লেগে যায়।
বিশ্বের মোট এলপিজি এবং তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী। বর্তমানে সেখানে সামরিক উত্তেজনা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওই পথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিমা সংস্থাগুলো পণ্যবাহী জাহাজগুলির জন্য ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি শুল্ক অভাবনীয় হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির পরিবহণ খরচ এক ধাক্কায় আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির অমোঘ নিয়ম মেনেই, এই বর্ধিত ব্যয়ের চূড়ান্ত বোঝা এসে পড়ছে ভারতের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতার কাঁধেই। এর সঙ্গে দোসর হিসেবে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির ক্রমাগত পতন। যেহেতু ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বহুমূল্য ডলার খরচ করে এই গ্যাস কিনতে হয়, তাই রুপির মান কমে যাওয়ায় একই পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে সরকারকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম বা ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো এই বিপুল আর্থিক লোকসান সামাল দিতে গ্যাসের ভরতুকি কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। পরিণামে, খুচরো বাজারে সিলিন্ডারের দাম আজ এমন বিন্দুতে পৌঁছেছে, যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির মাসিক বাজেটের মেরুদণ্ড আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে দিচ্ছে।
এই সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মারাত্মক আঁচ আজ সরাসরি এসে লেগেছে বাঙালির হেঁশেলে। সংসারের বাজেট সামলাতে বাড়ির গৃহিণীরা এখন নিজেদের অভ্যস্ত রান্নার ধরনে আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছেন। মহার্ঘ গ্যাসের নীল শিখা বাঁচাতে তাঁরা চিরাচরিত রান্নার বদলে দ্রুত সেদ্ধ হওয়া পদের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। পরিস্থিতি এতটাই সংঘাতময় হয়ে উঠেছে যে, একুশ শতকের আধুনিক ও ডিজিটাল ভারতের স্লোগানকে ছাপিয়ে চারদিকে যেন আবার প্রাচীন ও অস্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ফতোয়া জারি হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম তো বটেই, এমনকি মফসসল বা আধা-শহুরে এলাকাগুলোতেও পুনরায় মাটির উনুন তৈরি করার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। ঘুঁটে, শুকনো কাঠ, বাঁশের কঞ্চি কিংবা পাতা জ্বালিয়ে ধোঁয়াময় পরিবেশে রান্না করার আদিম পদ্ধতিকে আধুনিকতার খাতিরে আমরা পেছনে ফেলে এসেছিলাম। আজ চরম নিরুপায় হয়ে মানুষ সেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই নিজেদের আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক। কাঠ বা ঘুঁটের ধোঁয়ায় রান্না করার ফলে গৃহস্থালির নারীদের ফুসফুসের স্বাস্থ্য ও চোখের দৃষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি প্রতিদিনের এই জ্বালানি সংগ্রহের পেছনে গ্রামীণ মানুষের অতিরিক্ত কায়িক শ্রম ও অমূল্য সময়ের বিশাল অপচয় হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে এবং নারীদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে দেশজুড়ে ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র মাধ্যমে ধোঁয়ামুক্ত রান্নাঘরের যে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল, তা আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটচালে এক বড়সড়ো ব্যর্থতার মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি আসলে একটি ‘এনার্জি পভার্টি’ বা জ্বালানি দারিদ্র্যের অশনিসংকেত। যখন একটি উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ নাগরিককে তার আয়ের একটি বড় অংশ কেবল দু’বেলা অন্ন সংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি জোগাড় করতেই ব্যয় করতে হয়, তখন সেই পরিবারের জীবনযাত্রার মান ও পুষ্টির হার নিম্নগামী হতে বাধ্য। এই সংকট থেকে চিরস্থায়ী মুক্তির প্রধান শর্ত হল এলপিজি বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন করা। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ আজ এই বিকল্প পথে হেঁটে সাফল্য লাভ করেছে, যা ভারতের সামনে দৃষ্টান্ত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ আইসল্যান্ডের কথা বলা যায়। তারা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাদের ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক তাপ বা ‘জিওথার্মাল এনার্জি’-কে ব্যবহার করে রান্নার কাজ থেকে শুরু করে ঘর গরম রাখার প্রায় সমস্ত কাজ মেটায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও তাদের গায়ে আঁচ লাগে না। একইভাবে ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলি সমুদ্র উপকূলবর্তী বায়ুগতি বা ‘উইন্ড এনার্জি’-কে ব্যবহার করে নিজেদের বিদ্যুৎ গ্রিডকে এতটাই শক্তিশালী করে তুলেছে যে, সেখানে রান্নার জন্য গ্যাসের সিলিন্ডারের প্রয়োজন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এখানকার মানুষ সম্পূর্ণভাবে ইলেক্ট্রিক ইন্ডাকশন বা স্মার্ট কুকার ব্যবহার করছেন।
ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে আমাদের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হল সৌরশক্তি। ইজরায়েলের মতো দেশে যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িতে সৌরশক্তি ব্যবহার করে জল গরম করা হয়, সেখানে ভারতের মতো একটি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সারাবছর পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া সত্ত্বেও আমরা কেন সৌর-উনুন বা ‘সোলার কুকিং গ্রিড’ তৈরিতে পিছিয়ে থাকব? ভারতের প্রতিটি পঞ্চায়েত বা ব্লকে যদি ‘কমিউনিটি সোলার কিচেন’ বা গোষ্ঠীভিত্তিক সৌর রান্নাঘর তৈরি করা যায়, তবে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর চাপ বহুগুণ কমবে। এছাড়া জার্মানির মতো দেশগুলো যেভাবে জৈব বর্জ্য থেকে বায়োমিথেন উৎপাদন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে, ভারতও তার বিশাল কৃষিজাত বর্জ্য এবং গোবর ব্যবহার করে ‘গোবরধন’ বা গ্যালভানাইজিং অর্গানিক বায়ো অ্যাগ্রো রিসোর্সেস ধন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামবাংলার প্রতিটি হেঁশেলকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। একইসঙ্গে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে সারের জোগানও নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর বা জাপানের মতো দেশগুলো যেভাবে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রান্নার কাজে লাগাচ্ছে, ভারতের নগর সভ্যতাকেও দ্রুত সেই ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ মডেলে রূপান্তরিত হতে হবে। একইসঙ্গে পিএনজি বা পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস নেটওয়ার্কের ব্যাপক বিস্তার এবং একে সরাসরি দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে রাশিয়া বা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পাইপলাইন চুক্তিতে আসা ভারতের জন্য এক কৌশলগত বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত মুক্তি আসবে তখনই, যখন ভারতের প্রতিটি রান্নাঘর ‘স্মার্ট ইলেক্ট্রিক কিচেনে’ রূপান্তরিত হবে এবং সেই বিদ্যুৎ আসবে সম্পূর্ণ পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে। সরকার যদি ইন্ডাকশন ওভেনের ওপর কর ছাড় দেয় এবং রান্নার জন্য বিশেষ ‘গ্রিন ট্যারিফ’ বিদ্যুৎ বিল চালু করে, তবেই আগামীদিনে সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত বাঙালি তার হেঁশেলের বাজেট সঠিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
(লেখক অক্ষরকর্মী ও প্রশিক্ষক)
The put up অগ্নিমূল্য জ্বালানি, বিকল্পই ভবিষ্যৎ appeared first on Uttarbanga Sambad.
