ভোটের খয়রাতি, অর্থনীতির অশনিসংকেত

ভোটের খয়রাতি, অর্থনীতির অশনিসংকেত

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত

একুশের বিধানসভা নির্বাচনে যখন রাজ্যে পালাবদলের প্রবল রাজনৈতিক ঝড় তুলেছিল বিজেপি, তখন শাসকদলের তূণ থেকে বেরিয়ে আসা অব্যর্থ ব্রহ্মাস্ত্রটির নাম ছিল ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্যের প্রায় অর্ধেক ভোটার, অর্থাৎ মহিলাদের সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নগদ অনুদান পৌঁছে দেওয়ার সেই ঘোষণা যে কতটা মাস্টারস্ট্রোক ছিল, তা ব্যালট বক্সের ফলাফলেই প্রমাণিত। পরিসংখ্যান বলছে, ওই নির্বাচনে ভোটদানকারী মহিলাদের অন্তত ৫০ শতাংশ ঢালাওভাবে জোড়াফুল প্রতীকে বোতাম টিপেছিলেন। বর্তমানে সেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উপভোক্তারা মাসে ১৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন। রাজ্যে এই মুহূর্তে এমন উপভোক্তার সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি, যাঁরা শাসকদলের এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং দুর্ভেদ্য ‘কোর’ ভোটব্যাংক।

নগদ অনুদানের এই পরীক্ষিত সাফল্যের ওপর ভর করেই, আসন্ন বিধানসভা মহারণের ঠিক মুখে সরকার উন্মোচন করেছে নতুন প্রকল্প— ‘যুবসাথী’। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি আদতে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ২.০’। এবার শাসকদলের রাডারে রয়েছে রাজ্যের কর্মহীন তরুণ প্রজন্ম। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই সমস্ত তরুণ-তরুণীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি মাসে ১৫০০ টাকা করে পাঠানো হবে, যাঁরা এখনও কোনও কর্মসংস্থানের মুখ দেখেননি। একুশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সি মাধ্যমিক পাশ যে কোনও বেকার নাগরিক এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। নারী, পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ— সবার জন্যই দরজা খোলা থাকলেও শর্ত হল, যিনি ইতিমধ্যেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন, তিনি এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবেন না। স্বাভাবিকভাবেই, এই উপভোক্তাদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যাই বেশি হতে চলেছে।

অর্থনীতির ব্যাকরণ নয়, বরং রাজনীতির পাটিগণিতই যে এই প্রকল্পের সময়রেখার নেপথ্যে রয়েছে, তা স্পষ্ট। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি প্রকল্পটি ঘোষণার সময় বলা হয়েছিল এটি ১৫ অগাস্ট থেকে কার্যকর হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ প্রশমনের তাগিদে আচমকা সেই দিনক্ষণ এগিয়ে আনা হয় ১ এপ্রিলে। শেষমেশ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে ঘোষণা করা হয় যে, সরাসরি টাকা পাঠানোর কাজ সেদিন থেকেই শুরু!

কিন্তু অর্থনীতিবিদ হিসেবে এই বিপুল ব্যয়ের উৎস খুঁজতে গিয়ে শিউরে উঠতে হয়। এই ‘যুবসাথী’ কি প্রকৃত জনকল্যাণ, নাকি স্রেফ কোষাগার উজাড় করা নির্বাচনি পপুলিজম? সদ্য প্রকাশিত নীতি আয়োগের ‘ফিসক্যাল হেলথ ইনডেক্স’ ২০২৫ এবং ২০২৬-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজকোষ পরিচালনার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশের একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে। এই রিপোর্টে রাজ্যকে উচ্চতর রাজস্ব ঘাটতি, অনুৎপাদক বা নিম্নমানের ব্যয় এবং ঋণের স্থায়িত্ব নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সহজ কথায়, পরিকাঠামো বা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে ধার করে অনুদান বিলির এই প্রবণতা রাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

ভোটের দামামা বাজতেই ‘যুবসাথী’ নিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে তর্জা শুরু হয়েছে। ফর্ম তোলার জন্য শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মাইলের পর মাইল লাইন দেখে বিরোধী শিবির একে ‘খয়রাতির রাজনীতি’ বলে তোপ দেগেছে। সরকারের পরিসংখ্যান যা-ই হোক না কেন, বাস্তব চিত্রটা ভয়াবহ। অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অন্তত ৮৪ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ–তরুণী মাসে মাত্র ১৫০০ টাকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন, যা একটি রাজ্যের মেধা ও মানবসম্পদের চরম অপচয়ের জীবন্ত দলিল। এঁদের প্রত্যেকেরই গলায় এক সুর—‘আমরা একটা সম্মানজনক চাকরি চাই, কিন্তু যতক্ষণ তা না জুটছে, খালি পকেটে ১৫০০ টাকাও মন্দের ভালো।’

তৃণমূল অবশ্য এই অনুদানকে কর্মহীনতার বাজারে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি ‘সেফটি নেট’ বা সুরক্ষা বলয় হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছে। তাদের পালটা যুক্তি— কর্মসংস্থানের আকাল শুধু বাংলায় নয়, গোটা দেশজুড়েই একটা জাতীয় সংকট। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বছরে ২ কোটি চাকরির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার বাস্তবায়ন কোথায়? শাসকদলের দাবি, সরকারি ক্যাম্পে ফর্ম তোলার এই বিপুল ভিড় আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি বাংলার মানুষের অগাধ আস্থারই প্রতিফলন।

তবে, যুবসাথীকে নিছকই কোনও শেষমুহূর্তের নির্বাচনি চমক ভাবলে ভুল হবে। দেড় দশক টানা ক্ষমতায় থাকার পর প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া যখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তখন এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত গেমচেঞ্জার। বিশেষ করে, ভোটার তালিকার সাম্প্রতিক ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’-এর পর শাসকদলের অন্দরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে এই প্রকল্পের বিকল্প ছিল না। নির্বাচনগুলোর ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে শাসকদলও বুঝেছে, শহুরে এবং আধা-শহুরে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশই হল এই তরুণ সম্প্রদায়। কর্মসংস্থানহীনতায় ক্ষুব্ধ এই জেন জেড ভোটাররা মুখ ঘুরিয়ে নিলে টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন ধাক্কা খেতে বাধ্য। ‘যুবসাথী’ মূলত এই অস্থির তরুণ সমাজকে শান্ত করারই এক মরিয়া কৌশল।

গোটা দেশজুড়েই আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ডাইরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফারের পথ বেছে নিয়েছে। এই প্রবণতাকে কমপেনসেটারি স্টেট বা ক্ষতিপূরণমূলক রাষ্ট্র-এর উত্থান বলে বর্ণনা করা যায়। অর্থাৎ, সরকার যখন নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধির সুযোগ বা উন্নত পরিকাঠামো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা সেই ব্যর্থতার ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে সরাসরি মানুষের হাতে নগদ টাকা তুলে দেয়। ‘চাকরি দিতে পারছি না? শিল্প আনতে পারছি না? ঠিক আছে, তার বদলে মাসে মাসে কিছু নগদ টাকা নিয়ে নাও!’— এটাই আজকের রাজনীতির অঘোষিত ফর্মুলা।

মাসে ১৫০০ টাকার এই অনুদান হয়তো ভোটের বৈতরণি পার করতে সাহায্য করবে, সাময়িক ক্ষতে প্রলেপও দেবে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে খোদ তরুণ প্রজন্মকেই। যে বয়সে তাঁদের দক্ষতা বাড়িয়ে (আপস্কিলিং) বিশ্ববাজারের যোগ্য প্রতিযোগী হয়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে তাঁদের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। মনে রাখবেন, আজ যে তারুণ্যকে বেকার ভাতার সান্ত্বনায় আটকে রাখা হচ্ছে, আগামী এক দশক পর তাঁরাই যখন কর্মহীন, দক্ষতাহীন এবং হতাশ এক প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছাবেন, তখন সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ সামলানোর মতো কোনও ‘ভাণ্ডার’ বা ‘সাথী’ প্রকল্প কিন্তু আর অবশিষ্ট থাকবে না।

(লেখক অর্থনীতিবিদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *